মডেল: জান্নাতুল মাওয়া জ্যোতি, পরিসংখ্যান বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
মডেল: জান্নাতুল মাওয়া জ্যোতি, পরিসংখ্যান বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর   ছবি: বেরোবি ফটোগ্রাফি ক্লাব

‘টেল অব হিলশা এন্ড এ বয়’ (লেখক: মো. হাবিবুর রহমান) গ্রন্থটি নিয়ে আলোচনার আগে বৈশাখ সম্পর্কে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। বঙ্গাব্দের সূচনালগ্নে বৈশাখ এলে বাংলা সংস্কৃতি ও প্রকৃতিতে এক বিশেষ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশের মানুষের কাছে বৈশাখ অত্যন্ত আবেগ ও অনুভূতির একটি বিষয়। যদিও বৈশাখে পান্তা-ইলিশ সবার ভাগ্যে জোটে না, তবুও মানুষ সাধ্যমতো তরমুজসহ নানা খাদ্যদ্রব্য ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে এই উৎসব উদ্‌যাপন করে।

এবারের বৈশাখে কবি, লেখক ও গবেষক মো. হাবিবুর রহমানের “টেল অব হিলশা এন্ড এ বয়” গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে, যা বৈশাখ ও ইলিশকে ঘিরে গল্পের ভুবনে নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে। আজকের এই লেখায় “ইলিশ ও এক বালকের গল্প (টেল অব হিলশা এন্ড এ বয়)” গ্রন্থের একটি পর্যালোচনা উপস্থাপন করা হলো।

বৈশাখ ও বাংলা সংস্কৃতি নিয়ে বহু কবি-সাহিত্যিক বিভিন্ন পঙক্তি রচনা করেছেন। যেমন কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় বলেছেন- ‘ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবৈশাখীর ঝড়, তোরা সব জয়ধ্বনি কর।’ আবার সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ইলিশ বন্দনায় লিখেছেন- ‘হালকা হাওয়ায় মেঘের ছাওয়ায় / ইলশেগুঁড়ির নাচ; ইলশেগুঁড়ির নাচন দেখে/নাচছে ইলিশ মাছ।’ বাংলা সাহিত্যে ইলিশ মাছের উপস্থিতি ও তাকে ঘিরে রস-রসিকতা বরাবরই পাঠকের আগ্রহ বাড়িয়েছে। তবে একসময় সুলভ হলেও বর্তমানে ইলিশের দাম আকাশচুম্বী।

‘টেল অব হিলশা এন্ড এ বয়’ গ্রন্থে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও দীর্ঘ নদী মেঘনা নদী-এর একটি দ্বীপে বসবাসরত একটি পরিবারের জীবনসংগ্রাম, স্বপ্ন, রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা এবং বিয়োগান্ত ঘটনার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মুসতাকিম খালেদ নামের এক কিশোর, যে ইলিশ মাছ খুব পছন্দ করে। অল্প বয়সেই পিতৃহীন হয়ে সে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে পরিবারকে সহায়তা করে। পড়াশোনার পাশাপাশি অবসরে মাছ ধরা ও অন্যান্য কাজে সে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়।

যেখানে সাধারণত এই বয়সে সন্তানরা পরিবারের কাছ থেকে সহায়তা পায়, সেখানে খালেদ নিজেই পরিবারের অর্থনৈতিক দায়িত্বে ভূমিকা রাখে। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলা করে সে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যায়। তার পরিবারের অন্য সদস্য তার মা আয়েশা আমিরা, যিনি এবং তার শিক্ষকরা খালেদকে বিজ্ঞান, উদ্ভাবন ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহী করে তোলেন।

গল্পে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক, জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ এবং বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ও বিতর্কের বিষয়গুলো সুন্দরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। উপন্যাসের অন্যতম আকর্ষণীয় চরিত্র সালাউদ্দিন, যিনি কাহিনিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। এছাড়া খালেদের পশু-পাখির প্রতি ভালোবাসা, খুনসুটি এবং পরিবেশ ও প্রাণীসম্পদের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ অত্যন্ত সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

গ্রন্থটিতে পরিবেশের প্রতি মানুষের অবহেলা ও নিষ্ঠুর আচরণ এবং তা থেকে উত্তরণের করণীয় বিষয়গুলোও তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের পানি সম্পদ, নদ-নদীর জীর্ণ দশা এবং সেগুলোর আর্তি বাস্তবতার নিরিখে উপন্যাসের বিভিন্ন স্তরে প্রকাশ পেয়েছে। ফলে বইটি পাঠকের মনে নদীকেন্দ্রিক বাস্তবতা সম্পর্কে নতুন করে ভাবনার উদ্রেক ঘটায়।

গ্রন্থে ফুল ও মালার প্রিন্টসহ বেশ কিছু চিত্র সংযোজন করা হয়েছে, যা পাঠকের কল্পনা ও চিন্তার জগতকে বিস্তৃত করে। প্রতিটি চিত্রে একটি করে বার্তা নিহিত রয়েছে, যা শিশু, কিশোর ও তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে সক্ষম।

মো. হাবিবুর রহমান রচিত ‘টেল অব হিলশা এন্ড এ বয়’ গ্রন্থটি The Regional Reporting Society (টিআরআরএস) কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে। বইটির সম্পাদক ফররুফ খসরু। এর শুভেচ্ছা মূল্য ৪০০ (চারশত) টাকা। বইটি বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রন্থাগার, পুস্তক বিক্রয়কেন্দ্র, Rokomari এবং Amazon-এ পাওয়া যায়।

এই গ্রন্থটি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সহায়ক পাঠ্য বা পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হলে ইলিশ, নদী ও একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এ বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এবং শিক্ষানীতি বিশেষজ্ঞদের বিবেচনা করা প্রয়োজন।