ঘরবন্দি মন মানেনি বাধা, হুইলচেয়ারেই বৈশাখবরণ।
ঘরবন্দি মন মানেনি বাধা, হুইলচেয়ারেই বৈশাখবরণ।   ছবি: আরটিএনএন

সকাল ৯টা বাজতেই চারুকলার ফটক থেকে ভেসে এল ঢাকের শব্দ। সেই তালের সঙ্গে মিলিয়ে পা ফেলছেন হাজারো মানুষ। কারও হাতে কাগজের বাঘ-সিংহ, কারও কাঁধে রঙিন পালকি। বৈশাখের তপ্ত রোদে যখন লাল-সাদায় সেজেছে শাহবাগ, তখন ভিড়ের ভেতর আলাদা করে চোখে পড়ল একজনকে। জটলার মাঝে হুইলচেয়ার ঠেলে এগিয়ে চলছেন এক তরুণী। উৎসবের রঙে তার পোশাকও রাঙানো, চোখে-মুখে শরতের আকাশের মতো স্বচ্ছ হাসি।

শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাকে দমাতে পারেনি। চারুকলার ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’র এই রঙিন স্রোতে তিনিও এক যাত্রী। ভিড় ঠেলে এগিয়ে যেতে যেতেই বলছিলেন, পয়লা বৈশাখের এই দিনে ঘরে মন টিকছিল না। মনে হলো, ক্যাম্পাসে না গেলে উৎসবটাই অপূর্ণ থেকে যাবে। আজ সারাদিন ক্যাম্পাসে থাকব, ভাইবোন আর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা হবে।

বাঙালির এই প্রাণের উৎসবে সামিল হতে আসা এমন হাজারো মানুষের পদভারে আজ মুখর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা এলাকা। এবারের শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে—‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। অশুভকে দূরে ঠেলে দিয়ে নতুন দিনের গান গাওয়াই যেন এই শোভাযাত্রার লক্ষ্য।

পাঁচ প্রতীকের লোকজ আয়োজন

এবারের শোভাযাত্রার মূল আকর্ষণ হিসেবে সাজানো হয়েছে পাঁচটি বিশালাকৃতির মোটিফ বা শিল্পকাঠামো। বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের মিশেলে তৈরি এই প্রতীকগুলোর প্রতিটিতে রয়েছে আলাদা বার্তা। গর্বিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বড় মোরগ যেন নতুন ভোরের বার্তা দিচ্ছে। তার পেছনেই আছে বিশালাকৃতির হাতি, শান্তির প্রতীক পায়রা, সুরেলা দোতারা এবং ক্ষিপ্রগতির ঘোড়া।

এসব বড় কাঠামোর ফাঁকে ফাঁকে রঙিন মাছ, বাঘ ও হরিণ শাবক, ছাগল, কাকাতুয়া ও ময়ূরের প্রতিকৃতি শোভাযাত্রায় যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা। চারুকলার শিক্ষার্থী ও শিল্পীদের হাতের ছোঁয়ায় প্রাণ পাওয়া এসব অনুষঙ্গ মুগ্ধ করেছে সাধারণ মানুষকে।

শোভাযাত্রাটি শাহবাগ মোড় ঘুরে আবার চারুকলার সামনে এসে শেষ হয়। তবে মানুষের ঢল থামেনি। রিকশার চড়া ভাড়া কিংবা যাতায়াতের বিড়ম্বনা তুচ্ছ করে কেউ পায়ে হেঁটে, কেউবা হুইলচেয়ারে ভর করে সামিল হয়েছেন বৈশাখের এই মহামিলনে।

তরুণীটির ভাষায়, উৎসব তো আর প্রতিদিন আসে না, আজকের দিনটি কেবলই আনন্দের।