শারীরিক সীমাবদ্ধতা কোনো বাধা  নয়, উৎসবের রঙ, সুর ও ভালোবাসার স্পর্শে মুছে গেছে সব ভিন্নতা।
শারীরিক সীমাবদ্ধতা কোনো বাধা নয়, উৎসবের রঙ, সুর ও ভালোবাসার স্পর্শে মুছে গেছে সব ভিন্নতা।   ছবি: আরটিএনএন

বাংলা নববর্ষ মানেই বাঙালির প্রাণের উৎসব-আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর বৈচিত্র্যের এক অপূর্ব মিলনমেলা। আর সেই আনন্দঘন আয়োজনেই এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে দেখা গেল এক অনন্য চিত্র, যেখানে শারীরিক সীমাবদ্ধতা কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বরং উৎসবের রঙ, সুর ও ভালোবাসার স্পর্শে মুছে গেছে সব ভিন্নতা, তৈরি হয়েছে এক অন্তর্ভুক্তিমূলক মানবিক পরিবেশ।

পয়লা বৈশাখ উদযাপন উপলক্ষে ক্যাম্পাসজুড়ে ছিল বর্ণাঢ্য আয়োজন। চারুকলা অনুষদের আনন্দ শোভাযাত্রা, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের পরিবেশনা এবং রঙিন পাঞ্জাবি-শাড়িতে সজ্জিত মানুষের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। এর মাঝেই বিশেষভাবে নজর কাড়েন বিভিন্ন শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী মানুষ।

হুইলচেয়ারে বসে কেউ গাইছেন রবীন্দ্রসঙ্গীত, কেউ আবার বন্ধুদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচছেন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা গান ও কবিতার আবৃত্তির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন নিজেদের প্রতিভা। তাদের চোখে-মুখে ছিল আত্মবিশ্বাস আর আনন্দের ঝলক, যেন এই উৎসব তাদের জন্য নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা।

এবারের আয়োজনে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, সহায়ক স্বেচ্ছাসেবক রাখা এবং নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়। ফলে তারা নির্বিঘ্নে উৎসব উপভোগ করতে পেরেছেন।

ছোটবেলা থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ঢাবির শিক্ষার্থী তন্ময় চন্দ্র বর্মন বলেন, “নববর্ষ শুধু আনন্দের নয়, এটি সমতারও প্রতীক। আজ আমরা সবাই একসঙ্গে উদযাপন করছি—কেউ আলাদা নই।” আরেক অংশগ্রহণকারী জানান, “আগে এমন অনুষ্ঠানে আসতে সংকোচ লাগত, কিন্তু আজ সবাই আমাদের আপন করে নিয়েছে। এটি সত্যিই অসাধারণ অনুভূতি।”

অনেকে মনে করছেন, এ ধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক আয়োজন সমাজে ইতিবাচক বার্তা ছড়ায়। এটি প্রমাণ করে যে, উপযুক্ত সুযোগ ও সহানুভূতিশীল পরিবেশ পেলে শারীরিক সীমাবদ্ধতা কোনো ব্যক্তির সম্ভাবনাকে থামিয়ে রাখতে পারে না।

দিনব্যাপী এ উৎসব শুধু বিনোদন নয়, বরং মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। নববর্ষের রঙিন আবহে গড়ে ওঠা এই মিলনমেলা যেন স্মরণ করিয়ে দেয়-আমরা সবাই এক; ভিন্নতা নয়, একতাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

নতুন বছরের এই প্রথম দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস তাই শুধু উৎসবের নয়, বরং ভালোবাসা, সমতা ও অন্তর্ভুক্তির এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে ধরা দেয়।