পয়লা বৈশাখ মানেই পান্তা-ইলিশ এমন এক ধারণা এখন প্রায় প্রতিষ্ঠিত। নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে ভোরবেলা পান্তাভাত আর ইলিশ ভাজা যেন এক অনিবার্য আয়োজন। কিন্তু এই চেনা দৃশ্য কি সত্যিই বহুদিনের ঐতিহ্য?
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, গল্পটা আসলে একটু ভিন্ন।
পান্তাভাতের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। বাংলার গ্রামীণ জীবনে এটি ছিল একেবারেই সাধারণ খাবার-সহজলভ্য, পুষ্টিকর এবং গরমের দিনে শরীর ঠান্ডা রাখার কার্যকর উপায়। মধ্যযুগীয় সাহিত্যেও এর উপস্থিতি দেখা যায়।
মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে ‘আমানি’ শব্দটি দিয়ে পান্তার জলীয় অংশের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই ‘আমানি’ ঘিরেই ছিল এক ধরনের আঞ্চলিক কৃষিভিত্তিক উৎসব, যেখানে ভেজানো ভাত খাওয়ার রেওয়াজ ছিল। গ্রামের মানুষ পান্তা খেতেন নুন, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ কিংবা ভর্তার সঙ্গে। কখনো ছোট মাছ থাকত, কিন্তু ইলিশ ছিল বিলাসী খাবার-সব সময়ের নাগালে নয়। ফলে পান্তা আর ইলিশের যুগলবন্দি ছিল না গ্রামীণ ঐতিহ্যের অংশ।
এই গল্পে মোড় আসে আশির দশকে। ধারণা করা হয়, ১৯৮০ বা ১৯৮১ সালের পয়লা বৈশাখে ঢাকার রমনায় একদল তরুণ নিজেদের উদ্যোগে প্রথম পান্তা-ইলিশের আয়োজন করেন। চাঁদা তুলে করা সেই ছোট্ট আয়োজনই পরে হয়ে ওঠে বড় এক সাংস্কৃতিক প্রবণতার সূচনা।
এর কিছুদিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রমনা এলাকায় পান্তা-ইলিশ বিক্রি শুরু করেন। ধীরে ধীরে তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তখন থেকেই পয়লা বৈশাখের সকাল মানেই রমনার সবুজে বসে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার এক নতুন সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানট রমনার বটমূলে বর্ষবরণের আয়োজন করে এলেও পান্তা-ইলিশ ছিল না সেই প্রাথমিক আয়োজনের অংশ। অর্থাৎ বর্ষবরণের সাংস্কৃতিক ধারার সঙ্গে এই খাবারের সংযোগ তৈরি হয়েছে পরে, একেবারেই নগরজীবনের প্রেক্ষাপটে।
নব্বইয়ের দশকে এসে এই প্রবণতা ঢাকার সীমানা পেরিয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও বাণিজ্যিক উদ্যোগ-সব মিলিয়ে পান্তা-ইলিশ দ্রুতই বৈশাখের এক পরিচিত প্রতীকে পরিণত হয়।
তবে অনেকের মতে, এটি এক ধরনের ‘পোশাকি ঐতিহ্য’। কারণ গ্রামীণ বাস্তবতায় পয়লা বৈশাখ মানেই পান্তা ছিল না। সামর্থ্য অনুযায়ী পোলাও-মাংস বা গরম ভাতই ছিল উৎসবের খাবার। তবুও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পান্তা-ইলিশ নতুন এক সাংস্কৃতিক অর্থ পেয়েছে।
আজকের দিনে পান্তা-ইলিশ শুধু একটি খাবার নয়; এটি এক ধরনের প্রতীক। এখানে যেমন আছে কৃষিভিত্তিক জীবনের স্মৃতি, তেমনি আছে শহুরে উদ্যাপনের ছোঁয়া। পুরোনো আর নতুনের এই মেলবন্ধনই পয়লা বৈশাখকে করে তোলে আরও জীবন্ত, আরও বহুমাত্রিক।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!