কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন ও রোবোটিক প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারে বিশ্বজুড়ে বদলে যাচ্ছে শ্রমবাজার। পাল্টে যাচ্ছে কর্মসংস্থানের ধরনও। একসময় যেসব কাজ কেবল মানুষের দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল ছিল, এখন তার বড় অংশই সম্পন্ন হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিতে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা বলছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ প্রচলিত চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও অটোমেশনের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি বিলুপ্ত হতে পারে।
যদিও একই সময়ে নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে রুটিনভিত্তিক ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো।
বিশ্বব্যাংকের ‘সাউথ এশিয়া ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে প্রায় ৭ শতাংশ চাকরি সরাসরি এআইয়ের কারণে ঝুঁকিতে রয়েছে।
তবে একই সঙ্গে প্রায় ১৫ শতাংশ চাকরিতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।
ডব্লিউইএফের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ক্যাশিয়ার, টিকিট বিক্রেতা, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর, প্রশাসনিক সহকারী, নির্বাহী সচিব, ব্যাংকের কাউন্টার কর্মকর্তা, সাংবাদিকতা ও ডাক বিভাগের কর্মীদের মতো পেশা। কারণ ডিজিটালাইজেশন, জেনারেটিভ এআই ও রোবোটিক অটোমেশন দ্রুত এসব কাজের জায়গা দখল করছে।
এ ছাড়া বিশ্বজুড়ে চালকবিহীন যানবাহনের ব্যবহার বাড়ছে। বাস, ট্রেন কিংবা অন্যান্য পরিবহন খাতে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বিস্তৃত হলে ভবিষ্যতে চালকনির্ভর চাকরিগুলোও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। যদিও বাংলাদেশে এখনো এ প্রযুক্তির বিস্তৃত ব্যবহার শুরু হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেরানি ও অফিস সহকারী ধরনের চাকরিগুলো আগামী বছরগুলোতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে। কারণ এসব কাজের বড় অংশই তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, ডকুমেন্ট ব্যবস্থাপনা ও নির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুসরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যা এআই তুলনামূলক সহজেই সম্পন্ন করতে পারে।
বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো অফিসের নানা কাজ ম্যানুয়ালি করা হয়। তবে প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, একজন কর্মী ৮ ঘণ্টায় যে কাজ করেন, এআই সেই কাজ অনেক কম সময়ে করতে সক্ষম। ফলে কম দক্ষতাভিত্তিক অফিস চাকরিগুলো দ্রুত সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাবে পরিবর্তন আসছে গণমাধ্যম খাতেও। সংবাদ সারাংশ তৈরি, অনুবাদ ও তথ্য বিশ্লেষণের মতো কাজে এখন এআই ব্যবহার হচ্ছে। ফলে প্রেস বিজ্ঞপ্তিনির্ভর সংবাদ, সাধারণ অনুবাদ বা রুটিন কনটেন্ট তৈরির সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
তবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, মাঠপর্যায়ের রিপোর্টিং, তথ্য যাচাই ও বিশ্লেষণধর্মী কাজের চাহিদা বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনজি অ্যান্ড কোম্পানির ‘জেনারেটিভ এআই অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব ওয়ার্ক ইন আমেরিকা’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে অফিসভিত্তিক বহু চাকরির কাঠামো বদলে যাবে। বিশেষ করে গ্রাহকসেবা, অ্যাকাউন্টিং সহায়তা, বেতন প্রক্রিয়াকরণ, ডেটা ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সহায়তা দ্রুত অটোমেশনের আওতায় চলে আসতে পারে।
তবে গবেষণাগুলো বলছে, সব চাকরি বিলুপ্ত হবে না, বরং অনেক পেশার কাজের ধরন বদলে যাবে। যেসব পেশায় মানবিক যোগাযোগ, সৃজনশীলতা, জটিল সমস্যা সমাধান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে মানুষের চাহিদা বজায় থাকবে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ব্যবস্থাপনা ও সৃজনশীল খাত তুলনামূলক নিরাপদ থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এআইয়ের প্রভাব এখন প্রযুক্তিখাতেও দেখা যাচ্ছে। ‘এআই ইমপ্যাক্ট অন লেবার ফোর্স অ্যান্ড সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারস’ শীর্ষক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এআইনির্ভর কোডিং টুল ও স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার প্রযুক্তি সফটওয়্যার প্রকৌশলীদের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে শুধু কোডিং জানাই যথেষ্ট হবে না, প্রয়োজন হবে সিস্টেম ডিজাইন, বিশ্লেষণী দক্ষতা ও জটিল সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং, কলসেন্টার, গার্মেন্টস ব্যবস্থাপনা, গণমাধ্যম এবং সরকারি অফিসগুলোতেও ধীরে ধীরে অটোমেশন ও এআইভিত্তিক সফটওয়্যার ব্যবহার বাড়ছে। এতে কম দক্ষতানির্ভর চাকরিগুলো চাপে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভয় পাওয়ার বদলে দক্ষতা উন্নয়নের দিকে জোর দেওয়া প্রয়োজন। কারণ ইতিহাস বলছে, প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিপ্লব কিছু চাকরি কমালেও নতুন ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি করেছে। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো নতুন বাস্তবতার সঙ্গে কত দ্রুত মানুষ নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!