শিশু ধর্ষণ, নৃশংস হত্যা—এর শেষ কোথায়?
শিশু ধর্ষণ, নৃশংস হত্যা—এর শেষ কোথায়?।   ছবি: সংগৃহীত

৫ আগস্টের পরবর্তী মাসগুলোতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। তার মধ্যে মাগুরার আলোচিত শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদান করা হলেও তা এখনও কার্যকর হয়নি। কথায় আছে, ঘটনার চাপে ঘটনা চাপা পড়ে—তারই যেন পুনরাবৃত্তি রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিশু শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে (৭) ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার মধ্য দিয়ে।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে আসামির উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ থাকে এবং পরবর্তীতে হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত অনুমোদন ও রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদন (প্রয়োজনে) করার মতো আইনি ধাপগুলো সম্পন্ন হতে হয়।

আইনি প্রক্রিয়া (যেমন আপিল ও হাইকোর্টের অনুমোদন) বাকি থাকায় রায় কার্যকর হতে আরও সময় লাগে। আর এই দীর্ঘসূত্রতায় আছিয়া, রামিসার মতো কত ফুল ঝরে পড়বে আইনের ফাঁদে? দেশের এই করুণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ড সিনেমার দৃশ্যের মতো দেখা ছাড়া আর কোনো উপায় আছে কি?

এ দেশে বহু শিশু হত্যার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। তাই আইনের প্রতি রামিসার বাবার চরম হতাশা ও ক্ষোভ। হয়তোবা তিনি বুঝতে পেরেছেন আইনের ফাঁদ। তাই আক্ষেপ করে বলেন, ‘এ দেশে বিচার হয় না, আমি আর কোনো বিচার চাই না!’ সন্তান হারানোর তীব্র যন্ত্রণায় বুক ফেটে যাওয়া এই আকুল আক্ষেপ নাড়িয়ে দিয়েছে পুরো দেশকে।

গণমাধ্যমের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, তিনি কোনো বিচার চান না, কারণ এই বিচার ব্যবস্থার ওপর তার আর কোনো আস্থা নেই।

২০২৫ সালে দেশে ধর্ষণের ঘটনার এক উদ্বেগজনক ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যায়, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ৫২.৩ শতাংশ বেশি। মহিলা পরিষদের প্রতিবেদনে, গেল বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৭৮৬টি ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

এর মধ্যে ৫৪৩ জনই ছিল ১৮ বছরের কম বয়সী কন্যাশিশু। পুলিশ সদর দপ্তরের দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা দেশে ধর্ষণের অভিযোগে ৭,০৬৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল।

২০২৬ সালের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান (জানুয়ারি–এপ্রিল) অনুযায়ী, এবছরের প্রথম চার মাসেই ধর্ষণের ধারা অব্যাহত রয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম চার মাসেই ১৮০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১২ বছরের কম বয়সী শিশু ছিল ৫৬ জন। তথ্য বিশ্লেষণ ও ভিন্নতামানবাধিকার কর্মীদের মতে, সামাজিক লোকলজ্জা, আইনি জটিলতা এবং নিরাপত্তার অভাবের কারণে বাস্তব চিত্র এই পরিসংখ্যানের চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।

তাছাড়া, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওঠানামার কারণে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনের সংখ্যায় কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়।

কী কী কারণে হতে পারে ধর্ষণের মতো ঘৃণিত কাজ?

বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী, সাধারণত ১৮ বছরের কম বয়সী যেকোনো ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়। যেহেতু শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে পরিপক্ব নয়, তাই আইনগতভাবে তাদের যৌন সম্মতি দেওয়ার কোনো ক্ষমতা থাকে না। ফলে কোনো শিশুর সঙ্গে জোরপূর্বক বা প্রলোভন দেখিয়ে যেকোনো ধরনের যৌন সম্পর্ক স্থাপন বা যৌন নিপীড়ন করাই হলো শিশু ধর্ষণ।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, শিশু ধর্ষণ কোনো একক ব্যক্তির অপরাধ নয়; বরং এটি সামাজিক কাঠামোর অবক্ষয় ও ত্রুটির ফল।

ধর্ষণ সংস্কৃতি সমাজে যখন অপরাধীদের বিচার হয় না, নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অভাব থাকে এবং লিঙ্গবৈষম্য প্রবল হয়, তখন অপরাধীরা আশকারা পায়।

পরিবার বা সমাজ থেকে যখন শিশুদের বা যুবকদের সঠিক নৈতিক শিক্ষা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ শেখানো হয় না, তখন তারা অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে।

সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা, নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে সমাজে শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ধর্ষকদের মধ্যে অন্য মানুষের কষ্ট বা বেদনা বোঝার ক্ষমতা (Empathy) থাকে না। তারা চরম মাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির হয়ে থাকে। একটি শিশু যখন ধর্ষণের শিকার হয়, তখন তার মনের ওপর গভীর ও স্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়।

সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই জঘন্য অপরাধ রোধ করতে হলে কেবল কঠোর আইনই যথেষ্ট নয়; বরং সমাজ থেকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করা, বুনিয়াদি স্তরে লিঙ্গ ও যৌনতা বিষয়ে সঠিক শিক্ষা দেওয়া এবং পারিবারিক নৈতিকতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।

এ বিষয়ে টেলিফোনে আলাপকালে আরটিএনএনের সাংবাদিক রায়হান বিন আব্দুল্লাহকে মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের পরিচালক নাসির উদ্দিন এলান জানান, দেশে ধর্ষণ বৃদ্ধি পেয়েছে—এটা একটি বাস্তবতা। এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দেশে যে পরিমাণ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, তা নিয়ে পুলিশের কাছে রিপোর্ট করতে চান না অনেক ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার। আমরা যে ঘটনাগুলো সামনে দেখছি, সেগুলো প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় অনেক কম।

তবে এই ধর্ষণ বৃদ্ধির পেছনে প্রাথমিক ও প্রধান কারণ হলো—ধর্ষকদের আইনের আওতায় কম আনা হয় এবং শাস্তিও কম হয়। যেখানে ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ড, সেখানে একজন ধর্ষক যদি ছাড়া পেয়ে যায়, এটি পরবর্তীতে আবারও অপরাধে জড়াতে উৎসাহিত করে।

এটি শুধু সরকারের একার পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সমাজ, পরিবার এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশও ঠিক করতে হবে। সরকারকে দায়ীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং শুধু থানা নয়, প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে কড়া বার্তা দিতে হবে। সাধারণ মানুষকেও কঠোর প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। ধর্মীয় অনুশাসন ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে।

এ দিকে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার গঠন করে। সে হিসাবে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের (বিএনপি) মেয়াদ মাত্র তিন মাস পূর্ণ হয়েছে।

নির্বাচনের আগে দলীয় কোন্দলে বিএনপির প্রায় সাড়ে তিনশ নেতাকর্মী নিহত হয়েছিল। সরকার গঠনের পর দলের তৃণমূলে দলীয় কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত হত্যা ও খুন বেড়ে চলছে।

এদিকে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের তৃণমূল সফরকে কেন্দ্র করে আবুল কাসেম নামে বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, কমেদপুর ইউনিয়নের এক নেতা এবং মহিলা দলের এক ইউনিয়ন নেত্রীর ১৫–১৬ বছর বয়সী মেয়েকে ঘিরে একটি অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে।

সরকারের তিন মাসের মেয়াদেই দেশের গ্রামগঞ্জে দলীয় নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ড সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। সরকারের এ দলীয় ভাবমূর্তি রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর নীতি ‘সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া’—তিনি এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন কি?

এ ছাড়া দেশের শিশু ধর্ষণ ও হত্যার বিচার দ্রুত কার্যকর করার দাবিতে জনগণের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। তাই তারা আইনের দীর্ঘসূত্রতায় ক্ষোভ ও বিরক্তি প্রকাশ করছে।

দেশে ধর্ষণ ও হত্যা একেবারে নির্মূল করা সম্ভব নয়। তবে এ জন্য প্রয়োজন সরকারের সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের প্রতিটি মানুষের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন থাকা। তাহলেই ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই সর্বোত্তম পন্থা’—এই নীতির বাস্তব প্রতিফলন ঘটবে।