দেশের বিভিন্ন স্থানে গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে অন্তত চারটি শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকা, সিলেট, ঠাকুরগাঁও ও মুন্সিগঞ্জে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মনে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ ইতিমধ্যে এসব ঘটনায় প্রধান অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করেছে এবং তারা আদালতে ও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অপরাধ স্বীকার করেছে।
পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে গলা কেটে হত্যা
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে ৭ বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। বুধবার (২০ মে) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাঈদের আদালত তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
আদালত সূত্র জানায়, জবানবন্দি দেয়ার আগে সোহেল রানাকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত কয়েকজন তাকে উদ্দেশ্য করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে সোহেল রানা হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনা বিবৃত করেন বলে জানা গেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, সোহেল রানা স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিতে সম্মত হওয়ায় আদালতে তা রেকর্ডের আবেদন করা হয়। সেই সঙ্গে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হয়েছে। এর আগে সোহেলকে ১০ দিনের রিমান্ডে চেয়ে আবেদন করা হলেও পরবর্তীতে সে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান আদালতে পৃথক দুটি আবেদন করেন। পুলিশের আবেদন থেকে জানা যায়, হত্যার শিকার শিশু রামিসা রাজধানীর একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সে বাসা থেকে বের হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার কৌশলে তাকে নিজেদের ফ্ল্যাটে নিয়ে যান।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য শিশুটিকে পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে অভিযুক্তদের ফ্ল্যাটের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান তারা। পরে অনেক ডাকাডাকিতেও কোনো সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন শিশুটির স্বজন ও প্রতিবেশীরা। ওই সময় ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে শিশুটির মাথাবিহীন মরদেহ পড়ে ছিল। আরেকটি কক্ষের ভেতরে একটি বালতির মধ্যে তার মাথাটি রাখা ছিল।
আবেদনে আরও বলা হয়, মরদেহ গুমের উদ্দেশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শিশু রামিসার মাথা শরীর থেকে আলাদা করা হয়। সেই সঙ্গে তার সংবেদনশীল অঙ্গ ক্ষতবিশত করা হয় এবং দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ বাথরুম থেকে শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে রাখা হয়। পরে কাটা মাথাটি বালতির মধ্যে রাখা হয়।
ঘটনার পর কক্ষের জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা। পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার সামনে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ঘটনার দায় স্বীকার করেছেন বলেও পুলিশের আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিলেটে সুটকেসে লাশ লুকানো হলো
সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদে ৪ বছরের শিশু ফাহিমা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা টিপে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এই জঘন্য অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে গত সোমবার (১৮ মে) রাতে কান্দিগাঁও ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে প্রতিবেশী ও দূরসম্পর্কের চাচা জাকির হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
জাকিরকে গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে মধ্যরাতে জালালাবাদ থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন স্থানীয়রা। পরে তার বাড়িঘর ভাঙচুর করেন বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
মঙ্গলবার (১৯ মে) সংবাদ সম্মেলনে সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, নেশাগ্রস্ত জাকির হোসেন ইয়াবার ঘোরে লিপ্ত হয়ে এই অপরাধ ঘটায়। নিহত শিশু ফাহিমা সিলেট সদর উপজেলার সোনাতলা গ্রামের দিনমজুর রাইসুল হকের মেয়ে। গত ৮ মে বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে ফাহিমার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার দুদিন আগে সে নিখোঁজ হয়।
পুলিশ জানায়, গত ৬ মে সকালে ফাহিমা প্রতিবেশী চাচা জাকিরের ঘরে গেলে সে তাকে ২০ টাকা দিয়ে দোকানে সিগারেট আনতে পাঠায়। সিগারেট নিয়ে ফেরার পর ঘরে কেউ না থাকার সুযোগে শিশুটিকে ধর্ষণ করে জাকির। ফাহিমা অজ্ঞান হয়ে পড়লে ধরা পড়ার ভয়ে তাকে গলা টিপে হত্যা করে।
হত্যার পর দুদিন নিজের ঘরের খাটের নিচে একটি সুটকেসে ফাহিমার নিথর দেহ লুকিয়ে রাখে জাকির। পরে মরদেহ থেকে গন্ধ ছড়াতে শুরু করলে রাতের আঁধারে সেটি বাদাঘাট এলাকার ডোবায় ফেলে আসে সে।
ঘটনার পর এলাকাবাসী যখন শিশুটিকে খুঁজছিল, তখন অভিযুক্ত জাকিরও তাদের সঙ্গে ছিল। এমনকি পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার সময়ও সে মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, মেডিকেল রিপোর্ট পাওয়ার পর ধর্ষণের অভিযোগ যুক্ত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এ ঘটনায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে আদালতে পুলিশ প্রতিবেদন জমা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ঠাকুরগাঁওয়ে ভুট্টা ক্ষেতে মিলল শিশুর লাশ
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায় ধর্ষণের পর লামিয়া আক্তার (৪) নামে এক কন্যা শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। গত বুধবার (১৩ মে) দুপুরে নিজ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর একটি ভুট্টা ক্ষেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে প্রতিবেশী নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুরশালিন (১৪) কে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে স্থানীয় জনতা।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে একই এলাকার ভড়নিয়া গ্রামে ভুট্টা ক্ষেতে কাজ করতে গিয়ে সেন্টু নামের এক ব্যক্তি শিশুটির নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। পরে তার চিৎকারে স্থানীয় লোকজন ও পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। পরে মরদেহ উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
লামিয়া আক্তার রাণীশংকৈল উপজেলা ধর্মগড় ইউনিয়নের ভড়নিয়া গ্রামের সফিফুল ইসলামের মেয়ে। আর আটক মুরশালিন একই গ্রামের শরিফুল ইসলামের ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিখোঁজের পর পরিবারের সদস্যরা সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও লামিয়ার কোনো সন্ধান না পেয়ে এলাকায় মাইকিং করেন। একপর্যায়ে স্থানীয় বাসিন্দা মহসিনা বেগম জানান, বুধবার দুপুরে তিনি ভুট্টা ক্ষেতে ঘাস কাটতে গিয়ে মুরশালিনকে শিশু লামিয়াকে কোলে নিয়ে যেতে দেখেন। পরে শিশুটির হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসীর সন্দেহ পড়ে তার ওপর।
রাণীশংকৈল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমানুল্লাহ আল বারী জানান, শিশুটিকে আগে ধর্ষণ করে পরে হত্যা করা হয়েছে। আসামি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তা স্বীকার করেছেন। শিশুটির মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ মর্গে পাঠানো হয়েছে এবং এ বিষয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ঘটনার খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সফল আলমগীর হোসেন ও সহকারী পুলিশ সুপার স্নেহাশিষ কুমার দাস ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। নৃশংস এ ঘটনায় এলাকায় চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
মুন্সিগঞ্জে প্রবাসীর মেয়েকে শ্বাসরোধে হত্যা
মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার সৎ মামার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত সৎ মামা রাজা মিয়াকে (৪৫) ঘটনাস্থল থেকেই আটক করেছে পুলিশ।
শনিবার (১৬ মে) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে উপজেলার বালুচর ইউনিয়নের খাসকান্দি মদিনাপাড়া গ্রামে এই নৃশংস ঘটনা ঘটে। নিহত কিশোরী ওই এলাকার কাতার প্রবাসী আনোয়ার হোসেনের মেয়ে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নিহতের পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, আটক রাজা মিয়া খুলনা জেলার মোড়লগঞ্জ থানার মৃত আকবর হাওলাদের ছেলে। তিনি প্রায় ছয় বছর ধরে নিহত কিশোরীর পরিবারের সঙ্গেই একই বাড়িতে বসবাস করে আসছিলেন। দুপুরে নিজ ঘরের খাটের ওপর ওই কিশোরীর নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে পরিবারের সদস্যরা পুলিশে খবর দেন।
বিকেল ৪টার দিকে সিরাজদিখান থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে রাজা মিয়াকে আটক করে। ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার শেষে থানার উপ-পরিদর্শক মো. শাহ আলী ও বালুচর ইউনিয়নের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য সালেহা বেগম জানান, প্রাথমিকভাবে নিহত কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যার স্পষ্ট আলামত পাওয়া গেছে।
এই হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ দ্রুত সময়ের মধ্যে অভিযুক্ত রাজা মিয়াকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
সিরাজদিখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নান জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত ব্যক্তি ঘটনার দায় স্বীকার করেছেন। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মুন্সিগঞ্জ সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। মৃতের পরিবার মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সিরাজদিখান সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার পারভেজ জানান, তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!