পবিত্র কোরআন মহান আল্লাহ বলেন, ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিক আল্লাহ নিজ দায়িত্বে রাখেননি। তিনি তাদের স্থায়ী ঠিকানাও জানেন এবং সাময়িক ঠিকানাও।
পবিত্র কোরআন মহান আল্লাহ বলেন, ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিক আল্লাহ নিজ দায়িত্বে রাখেননি। তিনি তাদের স্থায়ী ঠিকানাও জানেন এবং সাময়িক ঠিকানাও।   ছবি: সংগৃহীত

ইসলামের দৃষ্টিতে রিজিক একটি বহুমাত্রিক ও গভীর ধারণা। রিজিক কেবল ভাত-কাপড় নয়; বরং জীবনের সবকিছু যা মানুষকে আল্লাহ দান করেন—তা-ই রিজিক। মানবজীবনে অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম হলো ‘রিজিক’। ভবিষ্যতে কী হবে, কীভাবে সংসার চলবে—এই ভয় অনেক সময় আমাদের অস্থির করে তোলে। তবে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা রিজিকের ব্যাপারে বারবার অভয় দিয়েছেন এবং মানুষের দুশ্চিন্তা দূর করতে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ। মানুষ চেষ্টা করে, পরিকল্পনা করে, উপার্জনের পথ খোঁজে; কিন্তু চূড়ান্তভাবে রিজিকের ফয়সালা আসমান থেকেই হয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিক আল্লাহ নিজ দায়িত্বে রাখেননি। তিনি তাদের স্থায়ী ঠিকানাও জানেন এবং সাময়িক ঠিকানাও।

সবকিছুই সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৬)

কিন্তু শয়তান মানুষের অন্তরে ভয় সৃষ্টি করে; বিশেষ করে দারিদ্র্যের ভয় দেখিয়ে মানুষকে অন্যায় পথে ঠেলে দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং তোমাদেরকে অশ্লীলতার আদেশ করে, আর আল্লাহ তোমাদেরকে স্বীয় মাগফিরাত ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। আল্লাহ অতি প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৬৮)

অর্থাৎ যখন কেউ হালাল-হারামের সীমারেখা মেনে চলতে চায়, তখন শয়তান তাকে বলে, ‘এভাবে চললে তুমি গরিব হয়ে যাবে’, ‘বর্তমান দুনিয়া খুব কঠিন, এত কিছু মেনে বলতে গেলে তো দুনিয়ায় থাকা মুশকিল হয়ে যাবে’ ইত্যাদি। ফলে অনেক মানুষ এই ভয়কে সত্য ভেবে আল্লাহর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে এবং হারামের পথে পা বাড়ায়। অথচ কেউ যদি মহান আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ আস্থা রেখে চেষ্টা করতে পারে, তাহলে তার রিজিকের জন্য তাকে হারাম পথে পা বাড়াতে হবে না; আল্লাহই তার রিজিকের ব্যবস্থা করবেন। 

হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা যদি প্রকৃতভাবেই আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল হতে তাহলে পাখিদের যেভাবে রিজিক দেয়া হয়, সেভাবে তোমাদেরকেও রিজিক দেয়া হতো।

এরা সকালবেলা খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যাবেলা ভরা পেটে ফিরে আসে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৪৪)

এই হাদিসে তাওয়াক্কুলের প্রকৃত অর্থ তুলে ধরা হয়েছে। পাখি যেমন বাসায় বসে থাকে না, বরং চেষ্টা করে; তেমনি মানুষকেও হালালভাবে চেষ্টা করতে হবে; তবে অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে যে রিজিক আল্লাহই দেবেন। রিজিক শুধু টাকার নাম নয়; ঈমান, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের মহব্বত, ইবাদতের সুযোগ, সুস্থতা, নেক স্ত্রী-সন্তান, সৎ প্রতিবেশী বা সহকর্মী—সবই রিজিকের অন্তর্ভুক্ত।

কেউ দুনিয়ার সামান্য কিছু অর্থ পেল, বাড়িঘর পেল কিন্তু ঈমান আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের মহব্বত ও পরকালের সফলতা পেল না, সে পরিপূর্ণ রিজিক পায়নি।

বলতে গেলে তার এই প্রাপ্তি অস্থায়ী ও দ্রুত ধ্বংসশীল। তাই রিজিকে বরকত পেতে দৈনন্দিন জীবনে সর্বদা আল্লাহর হুকুমকে প্রাধান্য দিতে হবে; আখিরাতকে প্রাধান্য দিতে হবে। ব্যক্তিজীবন, কর্মজীবন কিংবা পারিবারিক জীবন—সব ক্ষেত্রে আখিরাতকে প্রাধান্য দিতে হবে।

আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন ও আখিরাত বিনষ্ট হয় এমন কোনো কাজ করা যাবে না। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আখিরাতের ফসল কামনা করে, তার জন্য আমি তার ফসল বাড়িয়ে দিই। আর যে ব্যক্তি (কেবল) দুনিয়ার ফসল কামনা করে, তাকে আমি তা থেকেই খানিকটা দান করি।  আখিরাতে তার কোনো অংশ নেই।’ (সুরা : আশ-শুরা, আয়াত : ২০)

তাই শুধু ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার জীবনকে সাজাতে আল্লাহর আইন লঙ্ঘনের কোনো সুযোগ নেই। যারা শুধু দুনিয়াকে প্রাধান্য দেয়, তারা দুনিয়ায় কিছু ফল পেতে পারে; কিন্তু আখিরাতে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নাম। অথচ দুনিয়ার জীবন যেভাবেই হোক, একদিন শেষ হয়ে যাবে; কিন্তু আখিরাতের জীবনের শুরু আছে, শেষ নেই। হারাম পথে উপার্জন ও চলাচলের কারণে যদি কারো জাহান্নামের ফয়সালা হয়ে যায়, তার সেখান থেকে ফিরে আসার কোনো সুযোগই থাকবে না।

দুনিয়ার জীবনে আমাদের জন্য যা বরাদ্দ রাখা হয়েছে তা আসবেই। সুতরাং কেউ যদি হালাল-হারাম উপেক্ষা করে, স্বার্থপর হয়ে কৌশলে হারামকে হালাল বানাতে চায়, তাহলে সে সাময়িকভাবে সফল মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সে ক্ষতিগ্রস্ত। কারণ সে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে যায় এবং আখিরাতের স্থায়ী সফলতা হারায়।

আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই তোমাদের প্রত্যেকের রিজিক ও আয়ু মায়ের গর্ভে লেখা হয়ে যায়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৪৩)

অন্য এক হাদিসে তিনি বলেন, “হে মানুষ,  তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং রিজিক অর্জনে সুন্দর পথ অবলম্বন করো। কেননা কেউ তার কাছে নির্ধারিত রিজিকের বাইরে কিছু পেতে পারবে না।” (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২১৪৪)

রিজিক বা জীবিকা কেবল অর্থ বা বস্তুগত সম্পদ নয়; বরং আল্লাহ প্রদত্ত সব নিয়ামতই রিজিক; যার মধ্যে শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক সবই অন্তর্ভুক্ত। আমরা প্রায়ই রিজিকের জন্য দৌড়ঝাঁপ করি, কিন্তু এই প্রক্রিয়াটিকে যদি আমরা আধ্যাত্মিক উন্নতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারি, তাহলে তা আমাদের জীবনকে আরও অর্থবহ ও পরিপূর্ণ করে তুলবে।

রিজিক বৃদ্ধির জন্য চারটি আধ্যাত্মিক চাবিকাঠি রয়েছে—তাকওয়া (আল্লাহভীতি), তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর ভরসা), ইয়াকিন (দৃঢ় বিশ্বাস) ও ইস্তিগফার (ক্ষমাপ্রার্থনা)। এই চার উপায়ে রিজিক সন্ধান করলে তা কেবল বৈষয়িক বিষয় আর থাকবে না; বরং এর মধ্য দিয়ে তখন একটা আধ্যাত্মিক উৎকর্ষও সাধিত হবে।

পবিত্র কোরআন ও হাদিস থেকে জানা যায়, বেশ কিছু কাজে মানুষের রিজিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় অর্থাৎ রিজিকে বারাকাহ কমে যায়। কাজগুলো হলো:

 ১. পাপকাজে লিপ্ত হওয়া
যেসব কাজে মানুষের রিজিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়; তার মধ্যে অন্যতম হলো গুনাহ বা পাপাচারে লিপ্ত থাকা।

২. কৃতজ্ঞতা আদায় না করা
মানুষ যখন প্রাপ্ত নিয়ামতের শোকরিয়া আদায় করে না, তখন তার থেকে সে নিয়ামত ছিনিয়ে নেয়া হয় আর এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানবজীবন এবং কমে যায় রিজিক। 

৩. মিথ্যা কসম খাওয়া ও ধোঁকা দেয়া
মিথ্যা কসম খাওয়া এবং মানুষকে ধোঁকা দিলে আয়-উপার্জনের বরকত চলে যায়। আর বরকত চলে যাওয়া মানে রিজিক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।

৪. সুদের কারবার করা

সুদের মাধ্যমে ব্যবসা বৃদ্ধি হয়, আপাতদৃষ্টে এমনটা মনে হলেও সুদের কারবারের দ্বারা ব্যবসার বরকত নষ্ট হয়ে যায়। আল্লাহ–তাআলা পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘আল্লাহ সুদকে ধ্বংস করে দেন এবং সাদাকাকে বর্ধিত করে দেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৬)

৫. জাকাত না দেয়া

জাকাত ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ বা মৌলিক বিধান। জাকাতের বিধান প্রণয়ন করে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে ভারসাম্য ঠিক রেখেছে ইসলাম। সঠিকভাবে জাকাতের বিধান আদায় না করলে রিজিকের বরকত উঠিয়ে নেয়া হয় এবং এতে রিজিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

রিজিক কেন সবার জন্য সমান নয়

রিজিক সমভাবে বণ্টন না হওয়ার পেছনে আল্লাহর বিশেষ প্রজ্ঞা ও হিকমত রয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে:

বিপর্যয় রোধ: ‘যদি আল্লাহ তাঁর সব বান্দাকে প্রচুর রিজিক দিতেন, তাহলে তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত। কিন্তু তিনি যে পরিমাণ ইচ্ছা, সেই পরিমাণ অবতীর্ণ করেন।’ (সুরা শুরা: ২৭)

পরীক্ষা: আল্লাহ কাউকে সম্পদ দিয়ে পরীক্ষা করেন, আবার কাউকে অভাব দিয়ে। সুরা বাকারার ১৫৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘ভয়, অনাহার এবং জানমালের ক্ষতির মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের পরীক্ষা করবেন এবং ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দেবেন।’

আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা শুধু পাপ মোচনের জন্য নয়; বরং জীবিকা লাভের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

এসএস