কোরআন হাদিসের আলোকে জিলহজ মাসের ফজিলত।
জিলহজ মাসের ফজিলত।   ছবি: সংগৃহীত

ইসলামের পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ মাসগুলোর একটি হলো জিলহজ মাস। এই মাসে আল্লাহ তাআলা ঈদুল আজহা ও হজ রেখেছেন। একটি হাদিসে আছে, প্রতিটি মুসলিমের ওপর জ্ঞানার্জন করা ফরজ। এই হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসগণ একমত হয়েছেন যে, সেই জ্ঞান অর্জন করা ফরজ যেটিকে ইলমে হাল বলা হয়। ইলমে হাল এমন ইলম, যা বর্তমানের আমার করণীয় বিষয়ের জ্ঞান। তাই এই মাসের গুরুত্ব ও ফজিলাত সম্পর্কে আমাদের জানা জরুরি।

চলুন, কোরআন ও হাদিসের আলোকে জেনে নেওয়া যাক জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা থেকে শুরু করে ঈদুল আজহা পর্যন্ত গুরুত্ব, তাৎপর্য এবং ফজিলাত।

আল্লাহ তাআলা কোনো কিছুকে গুরুত্ব দিলে তার কসম করে কোরআনে আয়াত নাজিল করেছেন। যেমন: তিন ফলের কসম করে আয়াত নাজিল করেছেন। ঠিক তেমনি আল্লাহ এই ১০ দিনের কসম করে আয়াত নাজিল করেছেন সূরা ফজরের এক নম্বর আয়াতে: وَالْفَجْرِ ﴿١﴾ وَلَيَالٍ عَشْرٍ

অর্থ: শপথ ভোরবেলার এবং শপথ দশ রাতের।
প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এবং ইবনে কাসির (র.)-সহ অধিকাংশ মুফাসসিররা বলেন, এই দশ দিন হলো জিলহজ মাসের চাঁদ দেখার পর থেকে ঈদুল আজহা পর্যন্ত দশ দিন।

সূরা আল-হজের ২৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন: وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَعْلُومَاتٍ

অর্থ: এবং তারা যেন নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ও ইবনে কাসির (র.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, আইয়্যামিম মা’লুমাত বলতে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা থেকে শুরু করে ঈদুল আজহার দিন পর্যন্ত বোঝানো হয়েছে।
এই আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর যিকির করার কথা বলেছেন। একজন মুমিনের উচিত এই দশ দিনে এমন কোনো দিন না যাওয়া, যে দিন আল্লাহর স্মরণ ব্যতীত অতিবাহিত হয়।

হাদিসের আলোকে চাঁদ দেখার পর থেকে ঈদুল আজহার দিন পর্যন্ত গুরুত্ব ও ফজিলাত:
উম্মে সালামা (রা.) হতে বর্ণিত একটি হাদিস: عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا رَأَيْتُمْ هِلاَلَ ذِي الْحِجَّةِ وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ، فَلْيُمْسِكْ عَنْ شَعْرِهِ وَأَظْفَارِهِ

অর্থ: নবি কারিম (সা.) বলেছেন, যখন তোমরা জিলহজ মাসের চাঁদ দেখবে এবং তোমাদের কেউ কোরবানি করার ইচ্ছা পোষণ করবে, সে যেন তার চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকে। (সহিহ মুসলিম: ১৯৭৭)।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত একটি হাদিস: عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: مَا مِنْ أَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيهَا أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنْ هَذِهِ الأَيَّامِ» يَعْنِي أَيَّامَ الْعَشْرِ. قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَلاَ الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ؟ قَالَ: «وَلاَ الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، إِلاَّ رَجُلٌ خَرَجَ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فَلَمْ يَرْجِعْ مِنْ ذَلِكَ بِشَيْءٍ»

অর্থ: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, জিলহজের প্রথম দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও কি এর চেয়ে উত্তম নয়? তিনি বললেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও এর চেয়ে উত্তম নয়; তবে সেই ব্যক্তির কথা ভিন্ন, যে নিজের জান ও মাল নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় বের হয়েছে এবং এর কোনো কিছুই আর ফেরত নিয়ে আসেনি। (সহিহ বুখারি: ৯৬৯)।

এই দশ দিনের ৯ জিলহজের রোজা রাখার গুরুত্ব সম্পর্কে হযরত কাতাদা (রা.) হতে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে: عَنْ أَبِي قَتَادَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ «صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ وَالسَّنَةَ الَّتِي بَعْدَهُ»

অর্থ: রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি যে, এটি তার পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা (ক্ষমা) হিসেবে গণ্য হবে। (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)।

উল্লেখিত আয়াত ও হাদিসসমূহ হতে জিলহজ মাসের নির্দিষ্ট এই দশ দিনের গুরুত্ব, তাৎপর্য ও ফজিলাত অপরিসীম। এমন অনেক আমল রয়েছে, যা অন্য মাসে করলেও তার ফজিলাত এ সময়ের মতো হয় না।

আল্লাহর রহমত, করুণা ও দানের এই নির্দিষ্ট সময়ে একজন মুসলিমের উচিত হবে এই সময়ের ফজিলাতগুলো আদায় করে নেওয়া; নয়তো আবার পূর্ণ একটি বছর অপেক্ষা করতে হবে এবং এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই যে একজন ব্যক্তি আগামী বছরে এই সময়টি তার জীবনে পাবে।