ককরোচ জনতা পার্টি, ব্যঙ্গের অস্ত্র ও জেন-জির বিতর্কিত উত্থান: প্রতিবাদের নতুন ভাষা নাকি বিভ্রান্ত প্রজন্মের সংকেত?, ককরোচ জনতা পার্টি (CJP): জেন-জি প্রতিবাদ, ব্যঙ্গ ও বিতর্কিত রাজনৈতিক উত্থান
ককরোচ জনতা পার্টি ও জেন-জি।   ছবি: আরটিএনএন

এ পৃথীবিতে যখনই অরাজগতা, দুর্নীতি, দুশাসন এবং হিতৈষিতার চাদরে দুর্মতির আবির্ভাব হয়েছে ইতিহাসে প্রতিবাদের পর সশস্ত্র বিপ্লবের আগমন ঘটেছে। কখনও জুলাই বিপ্লব আবার কখনও ককরোচ জনতা পার্টির রূপে। তবে অস্ত্র যে নানাবিধ হয়ে থাকে তার ধারণা অধিকাংশেরই নেই।


একটা সময় ঢাল-তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ হয়েছে। পরবর্তীতে ফার্স্ট জেনারেশন আর্মস দিয়ে, তার পর এডভান্সড আর্মস দিয়ে যুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে অস্ত্রের ধরণ ও মিশ্রণ পাল্টেছে। জর্জ কারলিন বলেছিলেন, কমেডির কাজ হলো ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করা এবং সমাজের ভণ্ডামি তুলে ধরা। অস্ত্র এবং ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ যদি একসাথে মিশে যায়, তবে তার তীব্রতা এবং তা কতটা তীক্ষ্ণ হতে পারে তা ভাবনার বিষয়।


আর এ মিশ্রণ যদি হয় জেন-জির সাথে, তবে তার গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু হবে বা না হবে—তার তোয়াক্কা কেউ করে না। শুধুমাত্র ফলাফলই দেখা যায়। জেন-জি এমন একটি জেনারেশন, যারা নিজের হাত-পা ভাঙাকেও হাস্যরসে পরিণত করে। এই জেনারেশন ভালো না; এদের মধ্যে অনেক কম জ্ঞান আছে। কিন্তু এরা যে কান্না করতে জানে না, এমনও নয়।


জেন-জির জন্মই চরম ক্ষণে। যে জন্মের পরই দুর্নীতি দেখে, যার প্রথম চোখ খোলার পরই পাপের দশটি রাস্তা সামনে এসে দাঁড়ায়—তারা ভালো হবে না, এটাই স্বাভাবিক। আর এটিই এদের চরম শক্তির উৎস। জেন-জিকে কোথায় কতটুকু দিতে হবে, সময় তা শিক্ষা দিয়েছে। অগ্রজ মহামান্য জেনারেশন যে বয়সে এসে বুঝতে শিখেছে, নির্ভীক হতে শিখেছে, সে বয়সেই জেন-জি পরিণত একটি জেনারেশন। যদি তা সহ্য করতে কষ্ট হয়, তাহলে এ কষ্ট হওয়াই ভালো।


শ্রীলঙ্কার গণঅভ্যুত্থান, বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং নেপালের গণঅভ্যুত্থানে তারা যথেষ্ট প্রমাণ রেখেছে। এবার সদ্য জন্ম নেয়া ককরোচ জনতা পার্টির পরিপালনের পালা। পরিপালন, সমর্থন না করতে পারলে অন্তত বাধা দেয়া উচিত না।


ককরোচ জনতা পার্টি নিয়ে যদি বলা হয়, সংক্ষেপে CJP বা ‘তেলাপোকা জনতা দল’ ভারতের একটি ব্যঙ্গাত্মক ও প্যারোডি রাজনৈতিক আন্দোলন, যা ২০২৬ সালের মে মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এটি কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নয়; বরং বেকারত্ব ও শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে তরুণদের ক্ষোভ প্রকাশের একটি অনলাইন প্রতীকী আন্দোলন।


২০২৬ সালের ১৫ মে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এক মন্তব্যে বলেন, কিছু যুবক কর্মসংস্থানের অভাব ও ব্যর্থতার কারণে ‘তেলাপোকার মতো ছড়িয়ে পড়ে’ এবং ‘সমাজের পরজীবী’ হয়ে ওঠে। এই মন্তব্য ঘিরে তরুণদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এর পরদিনই, ১৬ মে ২০২৬, অভিজিৎ দীপকে নেহাত মজার ছলে এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনের সূচনা করেন।


বিবিসি বাংলার তথ্য অনুযায়ী, এর সদস্যপদ শর্তগুলোও ব্যঙ্গাত্মক—বেকার, অলস এবং অনলাইনে সক্রিয় থাকা, পাশাপাশি অভিযোগ বা ‘র‍্যান্ট’ প্রকাশের সক্ষমতা থাকা। আন্দোলনটি নিজেকে ‘জিরো স্পনসর’ এবং বেকারদের কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরে।


যদিও এটি একটি প্যারোডি উদ্যোগ, তবুও এর ইশতেহারে চাকরির নিশ্চয়তা, বেকারভাতা, শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং জবাবদিহিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দাবিগুলো উঠে আসে। অল্প সময়েই এটি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং অফলাইনেও প্রতীকী কর্মসূচি দেখা যায়। পরবর্তীতে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় (MeitY) নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে এর এক্স (X) অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেয়, যা নিয়ে সমালোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়।

জেন-জি এমন কোনো বস্তু নয় যাকে সহজে উপেক্ষা করা যায়। যে ব্যবধান রয়েছে জেন-জি ও পূর্ববর্তী জেনারেশনের মধ্যে, তা পূরণে ক’জন এগিয়ে এসেছে? জেন-জির যত দোষ, তা সংশোধনে কতজন সত্যিকারের উদ্যোগ নিয়েছে? বরং প্রচলিত প্রবণতা হলো—জেন-জি খারাপ, এদের মধ্যে কোনো বাছ-বিচার নেই, এদের কথা ধর্তব্য নয়—এমন মন্তব্যই বেশি শোনা যায়। তবে তাই হোক।


যে অগ্রজ তার দেখানো পথ বিচার করে পরবর্তী জেনারেশন ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিচার করে বোঝা যায়, অদূর ভবিষ্যতে ভূ-রাজনীতির চিত্র পাল্টে যাবে এবং বিশাল এক ধ্বংসের মাধ্যমে আবার সব নবনির্মাণ হবে। তবে সেই ইতিহাসে কে কীভাবে নিজের অংশ নিশ্চিত করবে, তা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার।


অন্যায় যখন বন্যার মতো সবকিছু লেপটে নিতে থাকে, তখন ভালো মানুষ ও খারাপ মানুষ একসাথে তা প্রতিহত করে নবযুগের উত্থান ঘটায়।