সীমান্তে ভারতের চোখ রাঙানি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে খাটো করে
কাটাতারে ঝুলছে বিএসএফের গুলিতে নিহত বাংলাদেশি কিশোরী ফেলানির মরদেহ।   ফাইল ছবি

গত ১৮ বছরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফের হাতে প্রায় ৬১৯ বাংলাদেশি নিহত হলো। এ সংক্রান্ত দেন-দরবারে সার্বভৌমত্বের চেয়েও মানবাধিকার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেলো। এটা বাংলাদেশের পতিত স্বৈরাচারী আমলের নতজানু পররাষ্ট্র নীতির ফলাফল। সেই ধারাবাহিকতা এখানো ধরে রাখা হয়েছে। মনে রাখতে হবে যারা নিহত হয়েছেন তাদের ব্যক্তি পরিচয়ের চেয়ে রাষ্ট্রীয় পরিচয় এখানে মূখ্য। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব হতাহতের তথ্য উপস্থাপন আর পরামর্শ দিচ্ছে। ফলে বারবার “শূণ্য হত্যা” নীতির কথাটি উঠে এসেছে। এক্ষেত্রে দুই দেশ মিটিং করে সম্মত হচ্ছে; কিন্ত আত্মরক্ষার নামে বিএসএফ হত্যাকা- চলমান রেখেই চলেছে। এটা ভারতের কর্তৃত্ববাদী চিন্তার প্রকাশ। সে কারণেই ইস্যুটি মানবিকতার চেয়ে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বেশি জোড়াল প্রশ্ন।

ফেলানী হত্যাকাণ্ড ছিল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আলোচিত সীমান্ত হত্যা। সে সময়ে এটি কেবল শোচনীয় মৃত্যুর উদাহরণ হয়ে ওঠেনি। বরঞ্চ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইস্যুতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমালোচনার ঝড় তোলে।  সে সময়ে বাংলাদেশ সরকার যে তিনটি বিষয় বিবেচনায় প্রতিবাদ জানায়, তার মধ্যে, তৃতীয় বিষয় হিসেবে আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নটি কিছুটা জোড়ালো ছিল। কিন্তু প্রথম ও দ্বিতীয় বিষয় হিসেবে মানবাধিকার ও নাগরিকের ওপর বলপ্রয়োগের প্রশ্নটি ছিল অযথা নতজানু কূটনৈতিক পরিভাষা ছাড়া আর কিছু-না। কেননা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ভাষায়, এটি “সীমান্তে যুদ্ধপরিস্থিতি”র দৃষ্টান্ত। তারা ১০০টি ভিডিও সাক্ষাতকারের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যা, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, নির্যাতন ও অবৈধ আটকের সাক্ষ্য সাপেক্ষে এই মন্তব্য করে। মানবাধিকার ছোট বড় বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা চলে; নাগরিকের ওপর বলপ্রয়োগ যখন বলা হচ্ছে কিন্তু বিদেশি নাগরিকের বিষয়টিকে বিশেষ দৃষ্টিপাত করা হচ্ছে না। অথচ পরিস্থিতি শোচনীয় যুদ্ধংদেহী। সেখানে রাষ্ট্রের ওপর আঘাত হচ্ছে- বলতেই হয়। যাহোক ফেলানি হত্যার বিচার হয়নি বলেই সীমান্ত স্বাভাবিক হয়নি। বিএসএফ সংশোধন হয়নি।

তবে এই বিষয়টির সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লেষই বেশি স্পষ্ট হয়। ভারত বারবার দাবি করে চোরাচালান, পাচার, অনুপ্রবেশ ও মাদক নিয়ন্ত্রণে বিএসএফ এই হত্যাকাণ্ড চালাতে বাধ্য হয়। কিন্তু এই অপরাধের সঙ্গে কেবল বাংলাদেশিই জড়িত নয়। ভারতীয়দের সাথেই অপরাধগুলো যৌথভাবে সংগঠিত হচ্ছে। এসব চোরাকারবারির সাথে বিভিন্ন মহলের সংশ্লিষ্টতাও খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। সে দিকে না গিয়ে কেবল চোরকারবারি বাণিজ্যে স্বার্থহানী ঘটলে কিংবা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে চোখ রাঙানোর সময় হলেই “শুট অন সাইট” চালাচ্ছে তারা। এটা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী ও চরম দুরভিসন্ধি। জাতিসংঘ বারবার ভারতকে “শ্যুট অন সাইট” বন্ধ করতে বলেছে। কিন্তু বন্ধ হয়নি। উপরন্তু, সাম্প্রতিক সময়ের সীমান্তে গুলিবর্ষণ, জোরপূর্বক পুশইন ও নাগরিক যাচায় ছাড়াই বহিষ্কারের বিষয়গুলো জোড়ালো উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই তিনটি বিষয় দু’দেশের মধ্যে সম্পর্ক নষ্টের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তাছাড়া, বিজেপির সাম্প্রতিক বিজয়ে বাংলাদেশকে ঘিরে উস্কানীমূলক বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে বাগাড়ম্বর ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ বুলি পরিস্থিতিকে আরো সন্দেহের মধ্যে ফেলে দেয়। ওদিকে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে থেকে হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় ইস্যুটি বাইরে টেনে আনার উপক্রম চলছে। মনে রাখতে হবে, বিএসএফের এই সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভারতের স্থানীয় লোকদেরকে সহিংস হতে দেখা যায়। আবার তারাই নিজ দেশের মধ্যেও হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে। মুসলিমদের বাড়ি পুড়িয়ে তাদের সন্তানকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রেখে যে বার্তা দিতে চায় তা বাংলাদেশের রাজনীতি ও সার্বভৌমত্বের জন্য সচেতন হওয়ার মতো।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সবগুলো রাজনৈতিক দলকে একটি সাধারণ ও একক পাটাতনে দাড়িয়ে দেশ নিয়ে সঠিক চিন্তা করতে হবে। এটা অনিবার্য হয়ে পড়েছে। ভূ-রাজনীতির দিক দিয়ে বাংলাদেশ নিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রের অতি আগ্রহ যেমন আমাদের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়, তেমনি বারবার রাষ্ট্রকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয়। একটি উন্নত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র কাঠামো গঠন করা কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের মতো ছোট কিন্তু সম্ভবানাময়ী রাষ্ট্রের জন্য নিজ স্বার্থে শক্ত অবস্থান নেয়াটা কঠিন হতে পারে না। যদি নিজ রাষ্ট্রস্বার্থটি সবাই মিলে অনুমান করতে পারি। একটি ছোট হোক বা বড় হোক, উন্নতি করা কিংবা পরাশক্তিতে বলিয়ান হওয়ার প্রথম শর্তই হলো নিজ দেশের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা। ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলীয় প্লাটফর্মেও রাষ্ট্রের ব্যাপারে সচেতন হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের জনসাধারণ যেই জালিম সরকারকে প্রত্যাখ্যান করলো তাকেই ভারত আশ্রয় দিচ্ছে। বাংলাদেশের আইনে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামীকেও তারা আশ্রয় দিয়ে কী প্রমাণ করতে চায় এটা আমাদেও ভাবতে হবে। দেশের বেশিরভাগ অপরাধী আজ অপরাধ করে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র গড়ে তোলা বা গৃহযুদ্ধের দিকে রাষ্ট্রকে ঠেলে দেয়ার উপক্রম হয়েছে তা অনুমান করা যায়।

তবে সবকিছুর উর্ধ্বে সর্বপ্রথম মানবাধিকার মানদণ্ডে প্রশ্ন তুললে তাৎক্ষণিক সমাধানে আসা যায়। তাই বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন যেভাবে মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে সেভাবে এসব সীমান্ত সংকটে মানবাধিকারের বিবেচনায়ও সমাধানের পথে পথ-হাতরানো চলে। বারবার পতাকা বৈঠক ও ডায়ালগ চালানোর বিকল্প নেই। তবে এসব বৈঠকে নতজানু হওয়ার কিছু থাকে না। প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে আমরা সুসম্পর্ক রাখতে চায় নিজেদের স্বার্থ রক্ষাপূর্বক। ভারতের সাথে আমাদের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। এই বিষয়টি কেবল এক পেশে হতে পারে না। মনে রাখতে হবে অর্থনৈতিক-ভৌগলিক বাস্তবতা, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও আঞ্চলিক যোগাযোগ প্রকল্পের মতো বিষয়গুলো দ্বিপাক্ষিক। তাই একেবারে ভারত প্রশ্নে হীনমন্য হওয়ার কোনও অবকাশ আমাদের নেই।

লেখক: পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।