ঐক্যের মাঝেও অনৈক্যের বালাকোট: আজকের বাংলাদেশ
ঐক্যের মাঝেও অনৈক্যের বালাকোট: আজকের বাংলাদেশ।   প্রতীকী ছবি

সীসাঢালা প্রাচীর যদি হয় তবেই মুসলিমদের বিজয় সুনিশ্চিত হতে পারে। ১৮৩১ সালের ৬ মে বালাকোটের সেদিনে অস্ত্র ও লোকবলের পরিসংখ্যান মুখ্য হয়ে উঠেছিল; তবে তার চেয়েও শোচনীয় সংকট সৃষ্টি করেছিল নিজেদের মধ্যে অনৈক্যের ধূম্রজাল। সৈয়দ আহমদ শহীদ (রহ.) লক্ষ্যে ছিলেন আজাদী। চিন্তায় ছিলেন ইসলামী আধ্যাত্মবাদী। প্রকাশিত হন দ্বীন প্রচারে, সংগঠনে ও সমরে। তাঁর দেখানো পথে এই উপমহাদেশে রাসূল (সা.)-এর দেখানো পথ অনেকেই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। কিন্তু কৌশল বা হিকমতে সবাই সাফল্যের মান অর্জন করতে পারেননি। কেননা, সমাজমানস খুবই গুরুত্ববাহী হয়ে ওঠে। সে সময়ের সমরকৌশল আর আজকের ভোটের কৌশল—সব ক্ষেত্রেই সমাজমানসের আকাঙ্ক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

রাসূল (সা.) মক্কা ছেড়ে মদিনায় থিতু হয়েছিলেন। কেননা মদিনা সমাজ তাঁকে তাঁর মতো করে চেয়েছিল। সেখানে তিনি ইসলামের সুমহান চেতনা ও চর্চা ব্যক্তি হৃদয়ে যেমন অঙ্কুরিত করেছিলেন, তেমনি সমাজবক্ষে সাংস্কৃতিক উচ্ছ্বাস তৈরিতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু বালাকোটের পেছনের কথা ঠিক এমনটি নয়। পেশোয়ারের কিছু মুসলিম সরদার শিখদের জুলুম সইতে না পেরে সৈয়দ আহমদের কাছে এসে আজাদীর আহ্বান জানিয়েছিলেন। যেমন করে কুফাবাসী আলীর (রা.) পুত্র ইমাম হোসাইনকে (রা.) আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু চেতনায় যাদের আখিরাত নেই তারা কখনো জিহাদের স্বর্গীয় সুরে অবগাহন করতে পারে না। তারা অলসতা, ভীরুতা এমনকি বিশ্বাসঘাতকতা পর্যন্ত প্রদর্শন করতেও কার্পণ্য করে না।

মদিনার আনসাররাও রাসূলকে (সা.) আহ্বান করেছিলেন; কিন্তু সে আহ্বানে ছিল আত্মসমর্পণ, ছিল আখিরাতের প্রতি পূর্ণ ইয়াকিন বা চেতনা। তাদের অন্তরবলেই বদর, উহুদের সীমা মাড়ানো স্পর্ধার ইতিহাস কিংবা মক্কা বিজয়ের যাত্রা। কিন্তু হুনায়নের যুদ্ধ ছিল মুসলিমদের শিক্ষা গ্রহণের পাঠপরিক্রমা। এই যুদ্ধে রাসূল (সা.) প্রথম অস্ত্র কিনেছিলেন। সৈন্য ছিল শত্রুদের চেয়ে বেশি। কিন্তু শত্রুর আক্রমণে সেদিন মুসলিম সৈন্যদের সিংহভাগই পেছন ফিরেছিল। আর আল্লাহ সঙ্গে সঙ্গে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, সৈন্যসংখ্যা ও অস্ত্র যুদ্ধজয়ের কারণ নয়; বরং বিশ্বাস ও চেতনাই শক্তি—তাতেই বিজয়।

যাহোক, বালাকোটের সেই লড়াইয়ে সেই ব্যক্তিই বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন, যাকে বিশ্বাস করে সৈয়দ আহমদ পেশোয়ারের শাসকের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সুলতান মুহাম্মদ খান। মুখ্য বিষয় হলো, যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল কিংবা অলসতা দেখিয়েছিল, তারা কেউই সৈয়দ আহমদের শিক্ষা-দীক্ষায় উদ্দীপ্ত মানুষ ছিল না। তারা তো ক্ষণকালের স্বার্থে, দম্ভ অথবা গোষ্ঠীগত অহমবোধ টিকিয়ে রাখার মানসে সৈয়দ আহমদের সঙ্গে মিশেছিল। কার্যত, লৌকিকতাকে ছাপিয়ে অলৌকিকতার টানে কেবল তারাই আত্মবিসর্জনের হিম্মত রাখে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে রাষ্ট্রের আজাদী আদায়ে লড়াই করে।

আজকের বাংলাদেশে যারা আজাদীর ডাক দিয়েছে, তারা ইসলামপন্থীদের সঙ্গে মিশেছে—এটা সুখকর। তবে গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে সংসদ সদস্য হতে পারা কিংবা সরকার গঠন করাই আসল বিজয় নয়; বরং বিজয় হলো রাষ্ট্রের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারা। এখানে দুটি বিষয় মুখ্য হয়ে উঠবে। প্রথমত, আজাদী আর ইসলামপন্থীদের একটি সাধারণ চেতনার জায়গায় আসতে হবে। সেক্ষেত্রে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র ও ইসলামী ভাবধারা—দুটো চেতনাকে কার্যকর করতে হবে। তারপর এই দুই চেতনার প্রকাশ হবে সমাজের চলমান চিন্তা ও চালচিত্রের সঙ্গে মানানসই রূপে। আগে সেই পথ সৃষ্টি করতে হবে, যে পথে সমাজ বুঝবে এই পথেই বাংলাদেশের মানুষের মঙ্গল নিহিত রয়েছে। সিংহভাগ মুসলিমের দেশ হওয়া সত্ত্বেও এখানে বেশিরভাগ মানুষ প্রায়োগিক অর্থে শরিয়া আইন চায় না। আবার ‘আজাদী’র আহ্বান বুঝলেও বড় দুই দলের প্রতি অন্ধ বিশ্বাসের কারণে রাষ্ট্রবিরোধী প্রতারণার ফাঁদে তারা পা দেয়। তাই সমাজে ইসলামী সংস্কৃতি ও আজাদী চেতনাকে বাস্তবভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং তার চর্চায় জনমানুষের সাড়া অর্জন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক স্বার্থের জায়গায় ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। ফলে যে ঐক্য সৃষ্টি হবে, তাতে সহজে যেন অনৈক্যের আগুন জ্বলে না ওঠে।

তবে জিন্নাহ সাহেবের মুসলিম স্বার্থে রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ায় ইসলাম মুখ্য হয়ে ওঠেনি—এটা মাথায় রাখা দরকার। এমনকি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ইনসাফনীতি যথেষ্ট ছিল না। ফলে মুসলিম জাতিসত্তার মাঝে অমুসলিমদের কুমন্ত্রণা ভাঙনের সুর বাজিয়ে তোলে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে আরও বেশি উপাদান হাজির হয়েছে। বিশ্বরাজনীতিতে ইসলাম ও মুসলিমের পক্ষে-বিপক্ষে নানা কৌশল শক্তভাবে মুখোমুখি অবস্থান নিচ্ছে। তুরস্কের এরদোয়ান, মিশরের মুরসি কিংবা ইরানে খোমেনি—এই তিন ধারায় বিশ্বরাজনীতিতে ইসলাম ও মুসলিম উপজীব্য হয়ে আছে। বাংলাদেশের ইসলামপন্থাকেও তাই এ দেশের মতো করে রাজনীতি করতে হবে। তাহলে এই সমাজকে সঙ্গে নিয়ে ইসলাম ও আজাদীর আন্দোলন গতি লাভ করবে। তবে ঐক্যের শক্তির মাঝে বালাকোটের ‘সুলতান মুহাম্মদ খান’-এর মতো কোনো অপেশাদার বাহিনী যেন কার্যক্রম না চালাতে পারে, সেদিকে নজর দিতে হবে। দায়িত্ব ও কর্তব্যের জায়গায় নিজস্ব, বিশ্বস্ত ও প্রশিক্ষিত লোকই অতি প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, সংগঠন কিংবা জোটের প্রতি যারা সঠিকভাবে আনুগত্য করতে পারে, তারাই পরবর্তীতে রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিধিবিধান ও প্রাসঙ্গিকতার আনুগত্য করতে পারে। আনুগত্য আর শৃঙ্খলা ছাড়া কোনো ঐক্য ধরে রাখা সম্ভব নয়। প্রসঙ্গত, ‘মুসলিম পরস্পর ভাই ভাই’ এই বোধই পারে মুসলিমদের অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত করতে। ওসমানী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তৎকালীন ইহুদিরা এই তত্ত্বই আবিষ্কার করেছিল। তাই তারা সবসময় মুসলিমদের বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত রাখতে বিনিয়োগ করতে থাকে। পরন্তু, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সততার ব্যতিক্রম ঘটলে যে অনাস্থা তৈরি হয়, তা যে কোনো সংগঠন বা শক্তিকে ভেঙে চুরমার করে দিতে পারে।

 
লেখক: পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।