কোন শিশুরা পরবর্তী জীবনে সফল ও সুখী হয়? হার্ভার্ডের ৭৫ বছরের গবেষণায় যা উঠে এসেছে
কোন শিশুরা পরবর্তী জীবনে সফল ও সুখী হয়? হার্ভার্ডের ৭৫ বছরের গবেষণায় যা উঠে এসেছে   ছবি: সংগৃহীত

আপনার শিশু পরীক্ষায় খুব ভালো ফল করছে না? তাতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই—যদি সে ঘরের কাজে অংশ নেয় এবং পরিবারের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ৭৫ বছরের গবেষণায় উঠে এসেছে, পরবর্তী জীবনে সফল ও সুখী হওয়ার ক্ষেত্রে শুধু মেধা বা পরীক্ষার ফল নয়, বরং দায়িত্ববোধ ও আবেগগত সম্পর্কই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


‘হার্ভার্ড স্টাডি অব অ্যাডাল্ট ডেভেলপমেন্ট’ নামে পরিচিত এই গবেষণা শুরু হয় ১৯৩৮ সালে। এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণাগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণাটির নানা অংশ প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৫ সালে হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের অধ্যাপক ও গবেষণাটির অন্যতম পরিচালক ড. রবার্ট ওয়াল্ডিং এক টেড টকে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন। এরপর বিশ্বজুড়ে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে।

গবেষণায় কয়েক দশক ধরে শত শত শিশু ও তাদের পরিবারের জীবন পর্যবেক্ষণ করা হয়। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভবিষ্যৎ জীবনে সফলতা ও সুখের সবচেয়ে শক্তিশালী পূর্বাভাস হলো-ছোটবেলা থেকে ঘরের কাজে অংশ নেওয়া এবং পরিবার ও কাছের মানুষের কাছ থেকে যত্নশীল ও গভীর সম্পর্ক পাওয়া। 

বুদ্ধিমত্তা নয়, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ববোধ
গবেষণা বলছে, জন্মগত বুদ্ধিমত্তা, পরীক্ষার ফল, সামাজিক মর্যাদা বা আর্থিক অবস্থান ভবিষ্যৎ সফলতার একমাত্র নির্ধারক নয়।

বরং যেসব শিশু ছোটবেলা থেকেই দায়িত্ব নিয়ে ঘরের কাজে অংশ নেয়, তারা ধীরে ধীরে শেখে—দায়িত্ববোধ, অন্যের প্রতি সচেতনতা ,নিজ উদ্যোগে কাজ করার মানসিকতা,ভেতর থেকে অনুপ্রেরণা পাওয়ার ক্ষমতা এবং সহানুভূতি ও সম্পর্কের মূল্য। 

মনোবিজ্ঞানীরা এই গুণকে বলেন ‘কনশিয়েনশিয়াসনেস’, যা দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্ব গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত। গবেষণায় দেখা গেছে, এই মানসিকতা ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার, স্বাস্থ্য ও জীবনের সন্তুষ্টির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

ঘরের কাজ কেন গুরুত্বপূর্ণ

গবেষণা অনুযায়ী, ছোট বয়স থেকেই ঘরের কাজে অংশ নেওয়া শিশুদের মধ্যে ‘আমি পারি’ ধরনের আত্মবিশ্বাস তৈরি করে।
এর ফলে তারা শেখে—

১. দায়িত্ববোধ
দলগতভাবে কাজ করা, পরিকল্পনা করা এবং দায়িত্ব পালন করার অভ্যাস গড়ে ওঠে।

২. সহানুভূতি ও কৃতজ্ঞতা
পরিবার কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে, তা বুঝতে শেখে। এতে অন্যের প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা বাড়ে।

৩. মানসিক দৃঢ়তা
সমস্যা এড়িয়ে না গিয়ে তা মোকাবিলা করার ক্ষমতা তৈরি হয়। এতে ধৈর্য, সাহস ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ে।

সফলতার পেছনে আরও ৩ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

১. ‘৯ মিনিটের সংযোগ’
স্নায়ুবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানী ড. জ্যাক প্যানকসেপের গবেষণা অনুযায়ী, শিশুর জীবনে দিনের তিনটি সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ-ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম ৩ মিনিট, স্কুল থেকে ফেরার পর প্রথম ৩ মিনিট এবং ঘুমানোর আগে শেষ ৩ মিনিট।

এই সময়গুলোয় মনোযোগ দিয়ে শিশুর সঙ্গে কথা বলা ও সম্পর্ক গড়ে তুললে তার আবেগগত নিরাপত্তা বাড়ে।

২. গ্রোথ মাইন্ডসেট
শুধু প্রতিভার নয়, চেষ্টার প্রশংসা করাও জরুরি। এতে শিশু বিশ্বাস করতে শেখে যে পরিশ্রমের মাধ্যমে উন্নতি সম্ভব।

৩. কর্মজীবী মায়ের ইতিবাচক প্রভাব
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কর্মজীবী মায়েদের মেয়েরা ভবিষ্যতে তুলনামূলক বেশি আয় করে এবং নেতৃত্বের ভূমিকায় যায়। অন্যদিকে ছেলেরা ঘরের কাজে বেশি অংশ নেয় এবং পরিবারে দায়িত্বশীল আচরণ করে।

হার্ভার্ডের দীর্ঘমেয়াদি এই গবেষণার মূল বার্তা হলো—শিশুর ভবিষ্যৎ সফলতা শুধু মেধা বা পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করে না। বরং দায়িত্ববোধ, আবেগগত নিরাপত্তা, গভীর সম্পর্ক এবং বাস্তব জীবনের অভ্যাসই একজন মানুষকে দীর্ঘমেয়াদে সফল ও সুখী করে তোলে।

সূত্র: টাইম ইনভেস্ট

এমআর/আরটিএনএন