এখনও সন্ধান মেলেনি নাহিদা বৃষ্টির, লিমনের মরদেহ উদ্ধার।
এখনও সন্ধান মেলেনি নাহিদা বৃষ্টির, লিমনের মরদেহ উদ্ধার।   ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রে নিখোঁজের ১০ দিন পর জামিল আহমেদ লিমন (২৭) নামে এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করেছে দেশটির ফ্লোরিডা রাজ্যের প্রধান আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ। স্থানীয় সময় শুক্রবার সকালে হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের উপর থেকে পাওয়া যায় মরদেহটি।

লিমনের সঙ্গে একই সময়ে নিখোঁজ হন অপর বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা বৃষ্টি। নাহিদা বৃষ্টিকে এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে লিমনের রুমমেট ও সহপাঠী হিশাম আবুঘারবিয়েহকে আটক করেছে হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ।

গত বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) থেকে নিখোঁজ ছিলেন ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি। দেশে থাকা স্বজনদের দাবি, প্রেমের সম্পর্ক ছিল তাদের মধ্যে। কাউন্টি শেরিফের কার্যালয়ে সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে এ বিষয়ে।

জানা গেছে, গত ১০ দিন ধরে নিখোঁজ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। বিষয়টি নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছিল স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম ফক্স ১৩ নিউজ টাম্পা বে।

ইতোমধ্যে নিখোঁজের বিষয়টি নিশ্চিত করে বিবৃতি দেয় বিশ্ববিদ্যালয়টির পুলিশ বিভাগ। সাধারণ ডায়েরি করা হয় এ বিষয়ে। এ ঘটনায় উদ্বেগও জানায় সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা।

নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি। দুজনের বয়সই ২৭। পুলিশের দাবি, তাদের সর্বশেষ দেখা গিয়েছে গত বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল)।

ভূগোল, পরিবেশ বিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে অধ্যয়নরত লিমনের সবশেষ অবস্থান ছিল টাম্পা এলাকায় নিজ বাসায়। এরপর থেকে কারও সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। অন্যদিকে বৃষ্টিকে সবশেষ দেখা গিয়েছিল একইদিন (বৃহস্পতিবার) বিশ্ববিদ্যালয়ের টাম্পা ক্যাম্পাসের ন্যাচারাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস ভবনে। তিনি পড়ছিলেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে।

নিখোঁজের পরদিন গত শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) লিমন ও বৃষ্টির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন এক বন্ধু। না পেয়ে পুলিশকে জানান বিষয়টি। দেশে থাকা স্বজনরা এনবিসি নিউজকে জানিয়েছেন, এর আগে কখনো এমন হয়নি। হঠাৎ করে স্বেচ্ছায় উধাও হওয়ার মতো মানুষ তারা নন।

'লিমন ও বৃষ্টি ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সম্ভবত তাদের মধ্যে প্রেমও ছিল। ভবিষ্যতে বিয়ের পরিকল্পনাও করেছিলেন,' এনবিসি নিউজকে বলছিলেন লিমনের ছোট ভাই জুবায়ের আহমেদ। তবে বৃষ্টির বড় ভাই জাহিদ হাসান প্রান্তর দাবি, দুজনের মধ্যে এক সময় প্রেমের সম্পর্ক থাকলেও বর্তমানে খুব বেশি যোগাযোগ ছিল না।

জুবায়ের জানান, দুজনেরই বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা ছিল। ফ্লাইটের রিটার্ন টিকিটও কেটেছিলেন লিমন। নিখোঁজের পর তার বাসা থেকে পাসপোর্ট উদ্ধার করেছে পুলিশ।

স্বজনদের ভাষ্য, লিমন ও বৃষ্টিকে উদ্ধারে এফবিআইয়ের পদক্ষেপের অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ দূতাবাস। তবে নিখোঁজ দুজনের কেউই তাদের হেফাজতে নেই বলে নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই)।

এদিকে জামিল আহমেদ লিমন যেদিন নিখোঁজ হন তার দুদিন পরই ছিল থিসিস জমা দেওয়ার তারিখ। তার আগেই রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যান তিনি। একই সঙ্গে নিখোঁজ হন তার বান্ধবী নাহিদা বৃষ্টিকেও। দুজনেই ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট শিক্ষার্থী।

নিরাপত্তা বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাত্র এক মাইল দূরে লেক ফরেস্ট কমিউনিটির আবাসিক এলাকা ঘিরে তল্লাশি অব্যাহত রেখেছে। নাহিদাকে খুঁজে বের করার বিষয়টি এখন তদন্তকারীদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে, এক সহপাঠীর মৃত্যু ও নাহিদার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও প্রবাসী কমিউনিটির মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ এবং শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, নাহিদা বৃষ্টির সন্ধানে সব ধরনের প্রযুক্তিগত ও গোয়েন্দা কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে।

আলোচনায় লিমনের থিসিস

লিমনের পরিবার যুক্তরাষ্ট্রের সিবিএস নিউজকে জানিয়েছে, তিনি পরিবেশ বিজ্ঞানে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে পড়ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, লিমনের থিসিসের বিষয়বস্তু ছিল ফ্লোরিডার প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর ডাটা সেন্টারের প্রভাব নিয়ে৷

ইউএসএ টুডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জেনারেটিভ এআই মডেলসহ ডিজিটাল অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগুলো মূলত সংরক্ষিত থাকে বড় বড় 'ডেটা সেন্টারে'। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তের মতো ফ্লোরিডাতেও এখন অগণিত ডেটা সেন্টার গড়ে উঠছে। পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কা করে সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে স্থানীয়রা। সাধারণ মানুষের ওপর বিদ্যুৎ বিলের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে যন্ত্র শীতল করার জন্য অত্যধিক পানি খরচ— সব মিলিয়ে এই ডেটা সেন্টারগুলোর আশপাশের বাসিন্দারা চরম ভোগান্তিতে।

ফ্লোরিডার প্রস্তাবিত ডেটা সেন্টারগুলো নিয়েও জনমনে বাড়ছে ক্ষোভ। ডেটা সেন্টারগুলোর কারণে পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা এখন অনেকের জন্যই উদ্বেগের কারণ। অত্যধিক সম্পদ ভোগকারী এই স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে অনলাইনে এবং আইনপ্রণেতাদের মধ্যেও জোরালো হচ্ছে প্রতিবাদ।

ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ১০৭টি ডেটা সেন্টার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ১০ম স্থানে ফ্লোরিডা। এই ডাটা সেন্টার প্রজেক্টগুলোর পেছনে রয়েছে বড় বড় টেক কোম্পানিগুলো। ধারণা করা হচ্ছে লিমনের থিসিস সম্ভবত তাদের বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশি দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। তাদের পরিবারের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় বাংলাদেশি শিক্ষার্থী কমিউনিটিতে এখন দুশ্চিন্তা। ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তজা জানিয়েছেন, তারা সার্বক্ষণিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। সন্তোষজনক কোনো খবর এখনো তাদের কাছে নেই। পুলিশ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছু জানাচ্ছে না।