চাপের মুখে অর্থনীতি, দেশ কি গভীর সংকটের পথে?
বর্তমান অর্থনৈতিক নীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুটি বিপরীত লক্ষ্য একসঙ্গে সামলানো—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি।   ছবি: আরটিএনএন

দেশের অর্থনীতি এখন এক ধরনের বহুমুখী চাপের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি, অন্যদিকে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের গতি দুর্বল, বিনিয়োগে স্থবিরতা, আর ব্যাংক ও জ্বালানি খাতে বাড়তি চাপ—সব মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে উঠছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি কেবল সাময়িক চাপ, নাকি গভীর কাঠামোগত সংকটের দিকে অগ্রসর হচ্ছে অর্থনীতি?

অর্থনীতির বর্তমান অবস্থার সবচেয়ে বড় বিষয়টি হলো—এটি একক সমস্যা নয়, বরং একাধিক সংকট একসঙ্গে আমাদের দেশে কাজ করছে। মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় বাস্তব আয় কমে যাচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণত ভোক্তা চাহিদা হ্রাস পায়, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা আসে এবং নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত হয় না। বাংলাদেশেও এখন সেই লক্ষণ স্পষ্ট।

টানা কয়েক বছর ধরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী। বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত গতিতে বাড়ছে না, যা সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থাকলেও তা কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধির দিকে ঝুঁকছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগে আস্থার ঘাটতি এখন সবচেয়ে বড় বাধা। জ্বালানি সংকট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা-সব মিলিয়ে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে দ্বিধায় পড়ছেন।

বর্তমান অর্থনৈতিক নীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুটি বিপরীত লক্ষ্য একসঙ্গে সামলানো-মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ালে বিনিয়োগ কমে যায়, কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার কর্মসংস্থান বাড়াতে অর্থের সরবরাহ বাড়ালে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি জটিল ভারসাম্যের প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে।

খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, ব্যাংক খাতে দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং তারল্য সংকট পুরো অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। একাধিক ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তা দিতে হচ্ছে—যা আর্থিক খাতের গভীর দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

এই পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি ধীর করছে।

প্রবাসী আয় কিছুটা স্বস্তি দিলেও রপ্তানি খাত দুর্বল। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।

জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে ভর্তুকি ব্যয় বৃদ্ধি পেলে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা আরও সংকুচিত হবে।

আয় কমে যাওয়ায় দারিদ্র্যের হার আবার বাড়ছে। একই সঙ্গে আয়বৈষম্যও বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে জাতীয় আয়ের বড় অংশ অল্প কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত। এর ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতা দুর্বল হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতার জন্য নেতিবাচক।

অর্থনীতির বর্তমান সংকট কেবল সাময়িক নয়; বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার ফল বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এর মধ্যে রয়েছে-বিনিয়োগে আস্থার ঘাটতি, ব্যাংক খাতের অনিয়ম, রাজস্ব সংগ্রহে দুর্বলতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অকার্যকর প্রবৃদ্ধি কাঠামো।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য একটি সুসংগঠিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক কৌশল গ্রহণ করা জরুরি। তাঁদের মতে, এ কৌশলের মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে স্থিতিশীল নীতি গ্রহণ, ব্যাংক খাতে কঠোর সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিনিয়োগে আস্থা পুনর্গঠন এবং রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি অন্তর্ভুক্ত থাকা প্রয়োজন।

তাঁরা আরও বলেন, নীতিগত অগ্রাধিকার স্পষ্ট করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয় বলেও মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন ‘সংকটের মধ্যে স্থিতি রক্ষার’ পর্যায়ে আছে। এটি গভীর সংকটে পরিণত হবে কিনা, তা নির্ভর করছে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা, সংস্কারের গতি এবং আস্থার পুনর্গঠনের ওপর।

অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত কোন পথে যাবে- তা নির্ধারণ করবে বর্তমান সরকারের এই সময়ের সিদ্ধান্তগুলোই।