রোহিঙ্গা, শরণার্থী, নির্বাচন
কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলো ১ মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর আশ্রয়স্থল   ছবি: সংগৃহীত

বৃহস্পতিবারের এক বিকেল। ১৯ বছর বয়সী মাহমুদুল হাসান কক্সবাজারের বালুখালী রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে তার বাঁশ ও তারপলিন দিয়ে তৈরি ঘরে বসার জায়গা ঠিক করছিলেন। কিছুক্ষণ পরই সেখানে ৩৫টি শিশু উপস্থিত হলো। হাসান নিজেও বয়সে কিশোর, কিন্তু তিনি এই শিশুদের শিক্ষক। রাখাইন ভাষায় শিশুরা তাকে সম্ভাষণ জানাল: ‘‘সায়ার, নে কাউং লার? [স্যার, কেমন আছেন?]’’ হাসানের পরিচালিত কমিউনিটি স্কুলে প্রায় ৮০ জন শিশু পড়ে, যাদের তিনি বার্মিজ, ইংরেজি এবং গণিত শেখান।

ঠিক পাশেই মোটরসাইকেলে থাকা এক বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তা মাইকে ১২ ফেব্রুয়ারির আসন্ন নির্বাচন নিয়ে ঘোষণা দিচ্ছিলেন। তিনি বলছিলেন, ৯ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শরণার্থী শিবিরের দোকানপাট বন্ধ রাখতে হবে এবং কাউকে শিবিরের বাইরে বের হওয়া যাবে না। তিনি আরও সতর্ক করে দেন—কোনো রোহিঙ্গা যদি রাজনৈতিক কোনো প্রচারে অংশ নেয়, তবে তাদের ‘কঠোর শাস্তি’ দেওয়া হবে। এমনকি তাদের রেশন কার্ড ও ভর্তুকি সুবিধাও বাতিল হতে পারে।

কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাস করেন। ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনের মুখে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার তাদের আশ্রয় দিয়েছিল। তবে নির্বাচনের এই সময়টিতে তাদের ওপর বিধিনিষেধ মনে করিয়ে দিচ্ছে, বাংলাদেশে তাদের জীবন আসলে ঝুলে আছে এক অনিশ্চিত সুতোয়—যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা এবং চলাফেরার স্বাধীনতা সবই সীমিত।

বাংলাদেশের ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটার যখন নতুন সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন মাহমুদুল হাসানের মতো রোহিঙ্গারা জানেন, এই প্রক্রিয়ায় তাদের কোনো ভূমিকা নেই। হাসান আল জাজিরাকে বলেন, ‘‘আমার নতুন কোনো প্রত্যাশা নেই। আমি মর্যাদা ও মানবাধিকার নিয়ে বাঁচতে চাই। এই জীবন [বাংলাদেশে] আমার পছন্দ নয়।’’ তবে তিনি স্বীকার করেন, উখিয়া ও টেকনাফ অঞ্চলে প্রধান দুটি রাজনৈতিক জোট—বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী—রোহিঙ্গাদের উদ্বেগের কথা বলেছে। এটি তাকে কিছুটা আশার আলো দেখায়।

‘এটি যথেষ্ট নয়’
২০১৭ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে হাসান বাংলাদেশে এসেছিলেন। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো গণহত্যা নিয়ে বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ICJ) তদন্ত চলছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল কাউন্সিলের (ARNC) সহ-সভাপতি নে সান লুইন বলেন, বাংলাদেশ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা থাকলেও রোহিঙ্গাদের সমাজের মূল স্রোতে মেশার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘‘ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকারের উচিত জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জীবিকার সুযোগ বাড়ানো।’’

তবে জাতিসংঘের তহবিল কমার কারণে রোহিঙ্গা শিবিরে মানবিক পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। ইউনাইটেড কাউন্সিল অফ দ্য রোহিঙ্গার সভাপতি সৈয়দ উল্লাহ বলেন, ‘‘নিরাপত্তাহীনতা, তহবিল হ্রাস এবং শিক্ষার অভাবে মানবিক পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে।’’

৬৪ বছর বয়সী রোহিঙ্গা দোকানদার হাফেজ আহমেদ বলেন, ‘‘হাসপাতালে শুধু সাধারণ ওষুধ পাওয়া যায়। জটিল কোনো রোগ হলে প্রাইভেট হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়, কিন্তু আমাদের কাছে টাকা নেই। রেশনও কমে যাচ্ছে; যা দেওয়া হয় তা যথেষ্ট নয়।’’

তরুণ শিক্ষক হাসানের কাছে ক্যাম্পের জীবন এক দুঃস্বপ্নের মতো। তিনি বলেন, ‘‘ক্যাম্প জীবন মানেই ট্রমা, এটি কারাগারের মতো। আমি বিশ্বমানের শিক্ষক হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু নিজেকে এখন ভাগ্যহীন ছাড়া আর কী বলব?’’ হতাশা থেকে মুক্তি পেতে অনেক রোহিঙ্গা আবার সেই বিপজ্জনক সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছেন। ইউএনএইচসিআর (UNHCR) এবং আইওএম (IOM)-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ৫,৩০০-এর বেশি রোহিঙ্গা সমুদ্রপথে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। এর মধ্যে ৬০০-এর বেশি নিখোঁজ বা নিহত হয়েছেন।

২৩ বছর বয়সী বিবি খাদিজা মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পাচারকারীদের হাতে আটক হওয়ার পর তিন বছরের সন্তানসহ কোনোমতে পালিয়ে আসেন। ফেরার পথে স্থানীয়দের কাছে সাহায্য চাইলে উল্টো মারধরের শিকার হন। তিনি বলেন, ‘‘তারা বলছিল—তোমরা রোহিঙ্গা, তোমরা সবসময় আমাদের জন্য সমস্যা তৈরি করো।’’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অবস্থান এখন জটিল এক সমীকরণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে তারা সম্ভাব্য গণহত্যার শিকার, অন্যদিকে স্থানীয় অপরাধ ও সামাজিক সেবার ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য তাদের দায়ী করা হচ্ছে।

‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’
আগস্ট ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। তার পতনের পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াত—উভয় দলই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের কথা বলেছে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ইসরাফিল খসরু বলেন, ‘‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিএনপির জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ১৯৯২ সালে খালেদা জিয়ার শাসনামলে আমরা সফলভাবে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠিয়েছিলাম। আমরা তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে বিশ্বাসী।’’

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি আহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘‘রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো আমাদের দলের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।’’ তিনি মনে করেন, চীন ও ভারতের মতো দেশগুলোকে এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানভীর হাবিব বলেন, নির্বাচনী প্রচারণায় রোহিঙ্গা ইস্যু খুব একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের টমাস কিন মনে করেন, যে দলই ক্ষমতায় আসুক, রোহিঙ্গারা তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের পদক্ষেপকে স্বাগত জানাবে। কিন্তু তাদের মূল লক্ষ্য প্রত্যাবাসন।

মানবাধিকার সংস্থা ফর্টিফাই রাইটসের পরিচালক জন কুইনলি সতর্ক করে বলেন, ‘‘রোহিঙ্গাদের কেবল নির্বাচনী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। প্রত্যাবাসনের বাইরেও একটি বিস্তৃত কৌশল প্রণয়ন করা জরুরি।’’ তবে সবাই রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতিশীল নন। কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দা ও ছাত্র মাহবুব আলম (২৯) রোহিঙ্গাদের ‘বোঝা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘রোহিঙ্গারা কম মজুরিতে কাজ করে আমাদের শ্রমবাজার দখল করছে। তারা আমাদের জন্য বড় সমস্যা।’’

সাবেক কূটনীতিক মেজর জেনারেল শহিদুল হক আল জাজিরাকে বলেন, ‘‘দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে মানুষ অধৈর্য হয়ে পড়ছে। এটি আমাদের আইনশৃঙ্খলা ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলছে। সবাই আশা করছে পরবর্তী সরকার এই সমস্যার সমাধান করবে।’’

সমাধান কী হবে তা এখনো অস্পষ্ট। তবে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা দোকানদার আহমেদ জানেন তিনি নতুন সরকারের কাছে কী চান—অধিকারসহ মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া। তিনি বলেন, ‘‘আমি আমার জন্মভূমিতে মরতে চাই। আমি আমার বাড়িতে ফিরতে চাই।’’

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই