শিশুরা পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ, সবচেয়ে নির্মল অংশ হওয়ার কথা। তাদের চোখে থাকার কথা বিস্ময়, কৌতূহল আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন। অথচ বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ের বাস্তবতা যেন উল্টো এক নির্মম চিত্র তুলে ধরছে। একের পর এক শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে উঠছে সমাজ। আরও ভয়ংকর বিষয় হলো—এই ঘটনাগুলোর অনেকগুলোর বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, অনেক মামলাই হারিয়ে যায় জনস্মৃতির অন্ধকারে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—বিচারহীনতার সংস্কৃতিই কি শিশু নির্যাতনের মতো ভয়াবহ অপরাধকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে?
রামিসা, আছিয়া, মুনতাহা, লামিয়ারা কেবল কয়েকটি নাম নয়; তারা হতে পারতো সম্ভাবনাময় কিছু শৈশবের প্রতীক। যাদের হাতে থাকার কথা ছিল বই, খেলনা কিংবা রঙিন স্বপ্ন, তাদের জীবন থেমে গেছে নিষ্ঠুরতার কাছে। সমাজ কিছুদিন শোকাহত হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ ওঠে, সংবাদমাধ্যমে আলোচনাও হয়; কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রতিবাদের ঢেউ স্তিমিত হয়ে যায়। নতুন কোনো ঘটনা পুরোনো ক্ষতকে চাপা দিয়ে দেয়। অপরাধীরা তখন বুঝে যায়—এই সমাজ খুব দ্রুত ভুলে যায়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই অন্তত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাদের অধিকাংশের বয়স ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। একই সময়ে নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাও ভয়াবহভাবে বেড়েছে। এসব পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি ভাঙা পরিবার, আতঙ্কিত একটি শিশু এবং একটি ক্ষতবিক্ষত ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে প্রায় সাড়ে তিন বছর সময় লাগছে। এই দীর্ঘসূত্রতা শুধু বিচারপ্রার্থীদের হতাশ করে না, অপরাধীদেরও সাহস জোগায়। কারণ তারা জানে—বিচার বিলম্বিত হলে অনেক সময় বিচার আর হয় না। সাক্ষ্যপ্রমাণ দুর্বল হয়ে পড়ে, ভুক্তভোগীর পরিবার ক্লান্ত হয়ে পড়ে, সামাজিক চাপ তৈরি হয়, আর একসময় মামলাটি গুরুত্ব হারায়।
এ কারণেই সাধারণ মানুষের মনে বিচারব্যবস্থা নিয়ে গভীর অনাস্থা তৈরি হচ্ছে। অনেকের মনে প্রশ্ন— ‘আমার সন্তানের সঙ্গে এমন কিছু ঘটলে আমি কি সত্যিই বিচার পাব?’ এই প্রশ্ন কেবল হতাশার নয়, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি আস্থাহীনতারও প্রতিফলন। যখন মানুষ বিশ্বাস হারাতে শুরু করে, তখন সমাজে আইনের শাসনের ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচার বিভাগের ওপর অতিরিক্ত মামলার চাপ, বিচারক সংকট এবং দীর্ঘ আপিল প্রক্রিয়া বিচার বিলম্বের বড় কারণ।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা বলছেন, দ্রুত শাস্তির দাবি আবেগের জায়গা থেকে এলেও বিচারপ্রক্রিয়ায় আইনি যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভুল বিচারের ঝুঁকি এড়ানোও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, কেবল আলোচিত বা ‘হাই প্রোফাইল’ কিছু মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি হয়। প্রতিটি ভুক্তভোগীই সমান ন্যায়বিচারের অধিকারী।
এই পরিস্থিতিতে নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা ১৫৬টি সংগঠন নারী ও শিশু নির্যাতনকে ‘জাতীয় জরুরি ইস্যু’ হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। তারা ধর্ষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়ন, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন এবং শিশু সুরক্ষায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে। এসব দাবি কেবল আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়; বরং একটি ক্রমবর্ধমান সামাজিক সংকট থেকে উত্তরণের প্রয়োজনীয় আহ্বান।
শুধু আইন করলেই হবে না, সেই আইন কার্যকর করার রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতাও প্রয়োজন। থানায় অভিযোগ নিতে গড়িমসি, ভুক্তভোগীকে হয়রানি, প্রভাবশালীদের চাপ কিংবা তদন্তে দুর্বলতা—এসব সমস্যা দূর না হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি কখনোই ভাঙবে না। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকেও শিশু সুরক্ষায় আরও সক্রিয় হতে হবে। শিশুদের নিরাপত্তা কেবল রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়; এটি পুরো সমাজের নৈতিক দায়িত্ব।
সবচেয়ে বড় কথা, বিচার কেবল শাস্তি দেওয়ার বিষয় নয়; এটি সমাজকে একটি মেসেজ দেয় যে অপরাধ করলে কেউ পার পাবে না। যখন সেই মেসেজ দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন অপরাধ বাড়ে। আজ যদি শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলোর দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করা না যায়, তবে আগামী প্রজন্ম বিচারব্যবস্থার ওপর কতটা আস্থা রাখবে—সেই প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় তার উঁচু ভবন বা অর্থনৈতিক উন্নতিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতায়। আর শিশুর চেয়ে দুর্বল ও সুরক্ষার দাবিদার আর কেউ নেই। তাই বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি ভাঙতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। নইলে হারিয়ে যাবে আরও অনেক শৈশব, নিভে যাবে আরও অনেক সম্ভাবনার আলো।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!