এ দেশে বিচার হয় না, আমি বিচার চাই না, রামিসার বাবা
রামিসার বাবা।   ছবি: সংগৃহীত

‘এ দেশে বিচার হয় না, আমি আর কোনো বিচার চাই না!’ সন্তান হারানোর তীব্র যন্ত্রণায় বুক ফেটে যাওয়া এক বাবার এই আকুল আক্ষেপ আর ক্ষোভ কাঁপিয়ে দিয়েছে পুরো দেশকে। রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিশু শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে (৭) ঘরে ফুসলিয়ে নিয়ে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার মাত্র ১০ ঘণ্টার মধ্যে মূল ঘাতক ও তার স্ত্রীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারলেও, নিথর সন্তানের লাশের সামনে দাঁড়িয়ে দেশের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে নিহত বাবার এই নির্মম আক্ষেপই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

“বিচার চেয়ে কী হবে?”। সাধারণত যেকোনো হত্যাকাণ্ডের পর পরিবারের একমাত্র দাবি থাকে ‘সুষ্ঠু বিচার’। কিন্তু রামিসার বাবার কণ্ঠে ঝরে পড়েছে এক চরম হতাশা ও ক্ষোভ। তিনি জানেন, এ দেশে বহু শিশু হত্যার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।

গণমাধ্যমের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, তিনি কোনো বিচার চান না, কারণ এই বিচার ব্যবস্থার ওপর তার আর কোনো আস্থা নেই। তার এই একটি বাক্যই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বত্র তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, যা দেশের বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ।

গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সকাল আনুমানিক ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি-ব্লকের একটি পাঁচতলা ভবনের তৃতীয় তলায় এই রোমহর্ষক ঘটনা ঘটে।

স্কুল ড্রেস পরে রামিসা যখন স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন হঠাৎ করেই সে নিখোঁজ হয়। চারদিকে খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে রামিসার মা পাশের ফ্ল্যাটের একটি সাবলেট কক্ষের দরজার বাইরে মেয়ের স্যান্ডেল পড়ে থাকতে দেখেন। সন্দেহ হওয়ায় প্রতিবেশীদের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকা মাত্রই স্তব্ধ হয়ে যান সবাই। খাটের নিচে পড়ে ছিল রামিসার রক্তাক্ত দেহ। আর বাথরুমের বালতি থেকে উদ্ধার করা হয় তার বিচ্ছিন্ন মাথা।

হত্যার মোটিভ নিয়ে পুলিশ জানায় ‘শিশু রামিসাকে একাকী পেয়ে ফুসলিয়ে নিজেদের ঘরে নিয়ে যায় পাশের কক্ষের বাসিন্দা সোহেল রানা। সেখানে তাকে পাশবিক ধর্ষণ করা হয়। ধর্ষণের কথা রামিসা যেন পরিবারকে বলে দিতে না পারে, সেই আতঙ্ক থেকেই তাকে ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। পরে লাশ গুমের উদ্দেশ্যে তার মাথাটি কেটে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে বালতিতে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।’

হত্যাকাণ্ডের পরপরই জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে গিয়েছিল মূল অভিযুক্ত জাকির হোসেন ওরফে সোহেল রানা (৩২) এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার। তবে ঘটনার মাত্র ১০ ঘণ্টার মধ্যে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে এই ঘাতক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পেশায় রিকশা মেকানিক সোহেল ও তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে।

রামিসার বাবার এই বুকফাটা আর্তনাদ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সারা দেশে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র নিন্দা জানিয়ে লিখেছেন, ‘প্রিয় সোনামণি রামিসা, তোমার কাছে মানবতা লজ্জিত।’

বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন অবিলম্বে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে খুনিদের ফাঁসি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। বর্তমানে পল্লবী এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং ঘাতকদের ফাঁসির দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দারা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছেন। তবে রামিসার বাবার কথা, “এ দেশে বিচার হয় না, আমি বিচার চাই না।” দেশের বিচার ব্যাবস্থা, প্রশাসন ও সরকারের মুখের উপর কড়া একটি প্রশ্ন। জাতী এখন এই প্রশ্নের জবাবের অপেক্ষায়।