মহান মে দিবস শ্রমিকের রক্তে রাঙা ইতিহাস
ইটের ভাটায় কাজ করে চেহারা পাল্টে যাচ্ছে শ্রমিকের।   ছবি: আরটিএনএন

১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে আন্দোলনে নামেন শ্রমিকরা। ওই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ৪ মে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক হে মার্কেট বোমা বিস্ফোরণ। পরবর্তীতে পুলিশের গুলিতে কয়েকজন নিহত ও অনেক মানুষ আহত হন। এ ঘটনার পর কয়েকজন শ্রমিক নেতাকে বিতর্কিত বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে বিশ্বব্যাপী তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। ফলে শ্রমিকদের সেই আত্মত্যাগই পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং ১ মে বিশ্বব্যাপী শ্রমিক অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দিন হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

বাংলাদেশেও দিবসটি যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হচ্ছে। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় দেশে ২০০৬ সালের শ্রম আইনসহ বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে, যেখানে কর্মঘণ্টা, ন্যায্য মজুরি, ছুটি, নিরাপত্তা ও সংগঠনের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্রে দেখা যায়, এসব আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক শ্রমিক এখনও আইনি সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছেন।

মে দিবস ঘিরে প্রতি বছরই শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি-দাওয়ার বিষয়গুলো সামনে আসে। ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং ট্রেড ইউনিয়ন করার স্বাধীনতা এসব দাবি দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছেন শ্রমিকরা। তৈরি পোশাক খাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু অগ্রগতি হলেও নির্মাণ, পরিবহন ও গৃহকর্মী খাতে শ্রমিকদের জীবনযাত্রা এখনও অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ।

সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিক কল্যাণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, শ্রমিক কল্যাণ তহবিল এবং স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা উন্নয়ন প্রকল্প শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা বাড়াতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সমন্বয় জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে শ্রমশক্তির অবদান অপরিসীম হলেও সমাজে এখনও অনেক ক্ষেত্রে শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না। তাই শ্রমিকদের প্রতি সম্মান, সহমর্মিতা ও ন্যায্য আচরণ নিশ্চিত করাকে মে দিবসের মূল চেতনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে শ্রমিক অধিকার এখন আন্তর্জাতিক বিষয়েও পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করে শ্রমনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা প্রতিটি দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর শিল্প খাতে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ,মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সংকট ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনে নতুন চাপ তৈরি করছে। বাংলাদেশও এসব চ্যালেঞ্জের বাইরে নয়। ফলে শ্রমিকদের সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মে দিবস শুধু অতীতের সংগ্রামের স্মারক নয়, এটি ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনাও দেয়। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান জানায় এ দিনটি।

মহান মে দিবসে শ্রমজীবী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিত উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। তাহলেই শিকাগোর সেই আত্মত্যাগ সত্যিকার অর্থে সার্থক হবে এবং গড়ে উঠবে একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ।