বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান   ছবি: সংগৃহীত

ঘাম ঝরানো শ্রমিকদের যথাযথ মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা গেলে তারা মালিকদের জন্য সবকিছু উজাড় করে দিতে প্রস্তুত থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। একই সঙ্গে দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও সরকার এই তিন পক্ষের সম্মিলিত অগ্রগতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন জামায়াত আমির। সভায় দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ পরিস্থিতি, শ্রমিক অধিকার ও রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সবাইকে নিয়েই বাংলাদেশ গড়তে চান তারা। আল্লাহ প্রদত্ত মেধা, দায়বোধ এবং সঠিক নিয়ত থাকলে একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব। তিনি বলেন, শ্রমিকেরা তাদের শ্রম ও ঘামের বিনিময়ে ন্যায্য সম্মান ও নিরাপত্তা পেলে মালিকদের জন্য সর্বোচ্চটা দিতে পিছপা হবে না।

সভায় অংশ নেয়া ব্যবসায়ীরা জানান, নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে লালফিতার দৌরাত্ম্য, দুর্নীতি ও টাকা পাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে জামায়াতের কাছ থেকে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি প্রত্যাশা করেন তারা। 

ব্যবসায়ীদের এই দাবির জবাবে জামায়াত আমির বলেন, ব্যবসায়ীদের সঠিক নিয়ত, জ্ঞান এবং ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা থাকতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, অনেকেই ক্ষুদ্র পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করে আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত ও সমৃদ্ধ হয়েছেন। ব্যবসায়ী ছাড়া সমাজ টেকসইভাবে দাঁড়াতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শ্রমিকদের মর্যাদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নারীদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব বলেও উল্লেখ করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমানে লালফিতার টানাপোড়েনে অনেক উদ্যোক্তা উৎপাদনে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন এবং নিরাপত্তার অভাবে শিল্পে বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন। ক্ষমতায় গেলে লালফিতার দৌরাত্ম্য কমিয়ে আনা হবে এবং ব্যবসায়ে কোনো ধরনের চাঁদাবাজির সুযোগ দেয়া হবে না বলে তিনি আশ্বাস দেন।

জামায়াত আমির আরও বলেন, তার দল শুদ্ধি অভিযানের নামে কাউকে দমন করতে চায় না, বরং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে চায়। জামায়াত পাহারাদারের ভূমিকা পালন করবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ক্ষমতায় গেলে ঘুষ ও চাঁদাবাজিমুক্ত একটি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা হবে। আলোচনার শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, একসঙ্গে দেশ গড়তে চান তারা। কী করা হবে, তা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করেই করা হবে, একক কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হবে না।

সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, কোনো মাস্টার প্ল্যান না থাকলেও সমস্যা হলে তার সমাধান হয়। তবে লালফিতার জটিলতা কাটাতে পারলে দেশ অনেক দূর এগোবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। পরিকল্পনা প্রণয়নে ‘সবুজ ফিতার’ মানুষদের অর্থাৎ মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ জামায়াত নেতাদের উদ্দেশে বলেন, রাজনীতিতে মাঝামাঝি অবস্থানের সুযোগ নেই। হয় সরকারে থাকতে হবে, নয়তো বিরোধী দলে। 

তিনি বলেন, লালফিতার কথা অনেকেই বলেন, তবে তার কাছে মনে হয় আসল সমস্যা লালফিতা নয়, বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। সরকার চাইলে লালফিতা পায়ের নিচেই থাকবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে যারা টাকা পাচার করেছে, তাদের অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনার বিষয়ে জামায়াতের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি চান তিনি।

মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বলেন, বর্তমানে লালফিতা এত ভারী হয়ে গেছে যে এক-দুটি কাঁচি দিয়ে তা কাটানো সম্ভব নয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর না হলে বিনিয়োগ আসবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। নিয়ম বারবার পরিবর্তনের কারণে বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হন বলেও জানান তিনি। শুধু রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করে অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, রপ্তানি খাত দুর্বল হয়ে পড়ছে।

বিসিআইয়ের সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ব্যবসায়ীরা শুধু লাভ নয়, সম্মানও চান। তার মতে, স্বাধীনতার অর্থ কেবল প্রশ্ন করার সুযোগ নয়, বরং স্বস্তির পরিবেশ। তিনি বলেন, শুধু গার্মেন্টস খাত দিয়ে দেশকে অনেক দূর এগিয়ে নেওয়া যাবে না। অটোমেশন ও নতুন নতুন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি নিরপেক্ষ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা থাকা অত্যন্ত জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, ব্যবসায়ীরা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নন। একই সঙ্গে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।