দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের জায়গা হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। কিন্তু অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মত ফ্যাসিবাদের থাবা থেকে মুক্ত ছিল না বুয়েটও। ফলশ্রুতিতে গত কয়েক বছরে এই ক্যাম্পাস পরিণত হয় একাধিক আলোচিত ও মর্মান্তিক ঘটনার মূল কেন্দ্রে।
২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর, বুয়েট ক্যাম্পাসে শেখ হাসিনার অন্যতম খুনিচক্র ছাত্রলীগ কর্তৃক আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড তাঁর জ্বলজ্বলে প্রমাণ। আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর বিচার চেয়ে যে তীব্র ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার অন্যতম মুখ ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী ফারদিন নুর পরশ। আর সেই প্রতিবাদী অবস্থানই শেষ পর্যন্ত তার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়ায়- এমনটাই মনে করে তার পরিবার।
সহপাঠীদের ভাষ্যে, আবরার হত্যার বিচার এবং বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি, বিশেষ করে ছাত্রলীগের কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যখন রাস্তায় নেমেছিল, তখন ফারদিন নুর পরশ ছিলেন সামনের সারির একজন সংগঠক। তার দৃঢ় অবস্থান, স্পষ্ট বক্তব্য এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন মনোভাব তাকে দ্রুতই ক্যাম্পাসে পরিচিত মুখে পরিণত করে।
সহপাঠীরা বলেন, “আমিই আবরার” আর্কাইভ তৈরি করে ফারদিন সংগঠিত করেছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের। ফ্যাসিস্ট হাসিনার মৃত্যু উপত্যকায় দাঁড়িয়ে ফারদিনের শত সাহসী জিজ্ঞাসা, “কীভাবে এদেশে বেঁচে থাকা যায়-১০১?” যা ভাইরাল হয়েছিল। ২০২২ সালের ১৩ আগস্ট ফারদিন নূর এক ফেসবুক পোস্টে ‘লাউড এন্ড ক্লিয়ার’ করে দিয়েছিল, সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতির ঠাঁই হবে না বুয়েট ক্যাম্পাসে।
কিন্তু এই দৃশ্যপট বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। হঠাৎ করেই নিখোঁজ হন ফারদিন। পরে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার হয়- যা পুরো দেশকে আবারও নাড়িয়ে দেয়।
ফারদিন হত্যা মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। কিন্তু চার বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
উল্লেখ, ডিবি পুলিশের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনের (যেখানে আত্মহত্যা দাবি করা হয়েছিল) বিরুদ্ধে ফারদিনের বাবার নারাজি আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত ২০২৩ সালের ১৬ এপ্রিল মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডি-কে নির্দেশ দেন।
তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আদালতের কাছে বারবার সময় পেছানোর আবেদন করেছে সিআইডি। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত অধিকতর তদন্তের জন্য দীর্ঘ সময় নেওয়ার পরও মামলার বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তা।
তাছাড়া সিআইডি দায়িত্ব নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরোনোর পর তদন্তকারী কর্মকর্তা ফারদিনের বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম, বিভাগ, রোল ও হল নম্বরসহ প্রাথমিক তথ্য জানতে চেয়ে হোয়াটসঅ্যাপে চিরকুট পাঠান। এতে সুষ্ঠু বিচার নিয়ে পুনরায় শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ফারদিনের পরিবার। এই দীর্ঘসূত্রিতা প্রশ্ন তুলছে- তদন্ত কি যথেষ্ট কার্যকর প্রক্রিয়ায় হচ্ছে?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডি’র এডিশনাল বিশেষ পুলিশ সুপার ও এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তানজিলা সিদ্দিকা সংবাদ মাধ্যম আরটিএনএন’কে বলেন, “বিষয়টিকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে ডিজিটাল ফরেনসিক, মোবাইল ট্র্যাকিং, সিসিটিভি ফুটেজসহ নানা তথ্য পুনরায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ডিবি পুলিশের করা প্রথম তদন্ত আদালতে গৃহীত না হওয়ায় নতুন করেই সবকিছু আমাদেরকে সংগ্রহ করে কাজ করতে হচ্ছে”।
অভিযোগ আছে তৎকালীন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের হুমকির পরেই ফারদিন গুম হন এবং কিছুদিন পর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ বিষয়ে সিআইডির কাছে জানতে চাওয়া হয় সন্দেহজনক কাউকে এজহারে নেওয়া হয়েছে কিনা? তদন্ত কর্মকর্তা তানজিলা বলেন, “ভিকটিমের বাবা মামলার এজাহারে কারো নাম উল্লেখ করে নাই। তবে আমরা বিষয়টি আমলে নিয়ে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি”।
ফারদিনের বাবা সাংবাদিক নুরুদ্দিন রানা সন্তান শোকে পাগল প্রায়। প্রিয় ছেলেকে হারিয়ে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তার কণ্ঠে এখন শুধু হতাশা- “চার বছর হয়ে গেল, এখনো জানি না আমার ছেলেকে কীভাবে হারালাম। বিচার পাবো কিনা সেটাও জানি না।” এই আর্তনাদ এখন নিত্যদিনের সঙ্গী এ পিতার।
ফারদিনের মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তার বাবা সংবাদ মাধ্যম আরটিএনএন’কে বলেন, বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগ সভাপতি ও তার দোসরদেরকে তখন এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করার কোনো সুযোগ ছিল না। রামপুরা থানা আমার মামলাটিই নিতে চায়নি। ভারত বিরোধী পোস্টের কারণে যেমন আবরার ফাহাদকে হত্যা করা হয়েছে, তেমনি আমার সন্তান ফারদিনকে খুন করা হয়েছে তথাকথিত মুজিব চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং বুয়েটে ছাত্রলীগের স্মরণসভা পণ্ড করে দেওয়ার কারণে।
ফারদিন হত্যা মামলার তদন্ত কার্যক্রম দ্রুত নিষ্পত্তি করে খুনিদের শাস্তি নিশ্চিত করতে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের কাছে অনুরোধ করেন ফারদিনের বাবা।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এমন আলোচিত একটি ঘটনায় দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত না হওয়া বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে অপরাধ প্রতিরোধেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাদের মতে, ফারদিন হত্যার রহস্য উদঘাটন শুধু একটি মামলার সমাধান নয়- এটি বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠনেরও পরীক্ষা।
স্পেনের মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২২-এ বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার কথা ছিল ফারদিনের। কিন্তু তার কয়েকদিন আগে, ২০২২ সালের ৫ নভেম্বর নিখোঁজ হন ফারদিন। ওইদিনই রাজধানীর রামপুরা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তার বাবা কাজী নূর উদ্দিন। নিখোঁজের দুদিন পর ৭ নভেম্বর সন্ধ্যা ৬টার দিকে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ফারদিন নূর পরশের মরদেহ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ। ৮ নভেম্বর সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে ফারদিনের মরদেহ নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার দেউলপাড়া কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এ ঘটনায় প্রথমে তার বান্ধবী বুশরাসহ অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে ‘হত্যা করে লাশ গুম’ করার অভিযোগে মামলা করা হয়। রামপুরা থানায় নিহত ফারদিনের বাবা নূর উদ্দিন রানা বাদী হয়ে এ মামলা করেন।
মামলায় ঐ বছরের ১০ নভেম্বর সকালে রাজধানীর রামপুরা এলাকার একটি বাসা থেকে বুশরাকে গ্রেফতার করা হয়। ওইদিনই তাকে আদালতে হাজির করে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য সাতদিনের রিমান্ড আবেদন করে রামপুরা থানা পুলিশ। শুনানি শেষে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি ঢাকার সপ্তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ তেহসিন ইফতেখার এ মামলায় আমাতুল্লাহ বুশরার জামিন মঞ্জুর করেন।
আন্দোলনের সাহসী কণ্ঠ থেকে নিঃশব্দ মৃত্যু- ফারদিন নুর পরশের জীবন যেন এক অসমাপ্ত গল্প। এর শেষ কবে লেখা হবে- সেই অপেক্ষায় তার পরিবার, সহপাঠী ও দেশবাসী।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!