পশ্চিমবঙ্গে মমতাযুগের অবসানের পর কঠোর হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার ক্ষমতা নিতেই নাগরিকত্ব, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অভিবাসন ইস্যুতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। নয়া মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষিত নাগরিকত্ব সংশোধন আইন ঘীরে ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’ নীতিকে ঘিরে ইতোমধ্যেই রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গন, সীমান্তবর্তী জেলা এবং কূটনৈতিক মহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি কলকাতায় এক সংবাদ সম্মেলনে শুভেন্দু অধিকারি জানান, অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ, ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। তার ভাষায়, ‘যারা বৈধ নাগরিক, তাদের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। কিন্তু অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ মে প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ২৭ কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া ও বর্ডার আউটপোস্ট নির্মাণের জন্য জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর ১৯ মে কলকাতার জনসভায় প্রথমবারের মতো ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’ নীতির রূপরেখা তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। ২০ মে নবান্নে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়।
তিন ধাপে বাস্তবায়ন
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম ধাপে ভোটার তালিকা, রেশন ডেটাবেস ও প্রশাসনিক নথির মাধ্যমে সন্দেহভাজন অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে যাদের নাগরিকত্ব বা পরিচয় সন্দেহজনক বলে মনে হবে, তাদের নাম ভোটার তালিকা এবং সরকারি সুবিধাভোগী তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে। তৃতীয় ধাপে আটক ব্যক্তিদের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের হাতে তুলে দিয়ে সীমান্তে পুশব্যাক করার পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজ্য সরকারের দাবি, পুরো প্রক্রিয়াটি দি ফরেন অ্যাক্ট ১৯৪৬ এবং কেন্দ্রের নির্দেশিকা অনুযায়ী পরিচালিত হবে। প্রশাসনের একাংশ জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের নির্দেশ অনুসারে সন্দেহভাজন বিদেশিদের ৩০ দিনের মধ্যে যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
সীমান্ত জেলায় উদ্বেগ
নীতির ঘোষণার পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে সীমান্তবর্তী মুর্শিদাবা এবং নদীয়া জেলা।
মুর্শিদাবাদে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মধ্যে নথিপত্র যাচাই নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নদীভাঙন ও দীর্ঘদিনের শ্রমভিত্তিক পরিযানের কারণে বহু পরিবারের পুরোনো কাগজপত্র অসম্পূর্ণ বা হারিয়ে গেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভুল তথ্য বা প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে প্রকৃত নাগরিকরাও হয়রানির শিকার হতে পারেন।
অন্যদিকে নদীয়ায় মতূয়া ও উদ্বাস্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে সিএএ বাস্তবায়ন নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বহু পরিবার মনে করছে, দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার পর এবার তারা স্থায়ী নাগরিকত্বের আইনি স্বীকৃতি পেতে পারে।
রাজনৈতিক উত্তাপ
বিরোধী শিবির এই নীতিকে ধর্মভিত্তিক বিভাজনের রাজনীতি বলে আখ্যা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের নামে সংখ্যালঘু ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করা হচ্ছে।
যদিও বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, এটি কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অভিযান নয়; বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও সীমান্ত সুরক্ষার প্রশ্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতি আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের ভোট রাজনীতি, জনসংখ্যাগত ভারসাম্য এবং কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও নজর
কূটনৈতিক মহলেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সীমান্তে দ্রুত বেড়া নির্মাণ ও পুশব্যাক নীতি বাস্তবায়িত হলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না পর্যবেক্ষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নাগরিকত্ব ও সীমান্ত প্রশ্নে পশ্চিমবঙ্গ এখন শুধু একটি রাজ্য নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর ভূ-রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
বিজেপির দাবি ও বাস্তবতা
বাস্তাবতার নিরিখে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। ভারতের যত রাজ্যে বিজেপি সরকার এসেছে সবকয়টি রাজ্যেই মুসলিম নিধন এবং সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের দৃশ্য সামনে এসেছে। মব সৃষ্টি করে হত্যা, মারধর করে জয় শ্রী রাম বলানো এমনকি হত্যার মতো বহু ঘটনা ইতোমধ্যেই সামনে এসেছে। তা হলো ২০১৫ সালে মোহাম্মাদ আখলাক নামের একজনকে উত্তরপ্রদেশের দাদরিতে গরুর মাংস রাখার গুজবে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়। ২০১৬ সালে ঝাড়খণ্ডের লাতেহারে দুই মুসলিম গবাদিপশু ব্যবসায়ী গাছে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। ২০১৭ সালে পেহলু খানকে রাজস্থানের আলওয়ারে গরু পাচারের অভিযোগে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়। অথচ তিনি গরুর দুধ বিক্রি করতেন।
২০১৭ সালে শুধুমাত্র মুসলিম পরিচয় জেনে জুনাইদ খানকে হরিয়ানায় ট্রেনে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। আবার একই বছরে ২০১৭ সালে রাকবার খানকে আলওয়ারে গরু পরিবহনের অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ২০১৯ সালের আলোচিত ঘটনা; তাবরেজ আনসারিকে ঝাড়খণ্ডে চুরির অভিযোগে বেঁধে মারধরের পর তার মৃত্যু হয়। ২০২০ সালে দিল্লি সহিংসতা। দিল্লির সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় বহু মুসলিমকে পিটিয়ে, গুলি করে ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ২০২৩ সালে নাসির ও জুনায়েদকে হরিয়ানায় অপহরণের পর পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।
এমন আরও বহু ঘটনা রয়েছে। বিহারে রোশান খাতুন নামে এক মুসলিম মহিলাকে রোজা অবস্থায় খুঁটির সাথে বেঁধে অত্যাচার করা হয় এবং ইফতারের সময় পানি চাইলে তাকে মদের সাথে গরুর পেশাব মিশিয়ে পান করানো হয় এবং এক পর্যায়ে তিনি মারা যান।
নির্বাচনের আগে এনআরসি এবং নাগরিকত্ব যাচাইয়ের আড়ালে মুসলিম সম্পদায়কে হেনস্তা এবং মুসলিম ভোট সংখ্যা কমিয়ে ত্রিণমূল কংগ্রেসকে নির্বাচনে পরাজিত করার কৌশল অবলম্বনেরও অভিযোগ উঠেছে। বিশেষজ্ঞ এবং বিরোধি দলীয় রাজনীতিবিদরা বলছেন, মূলত মুসলিম পরিচয়ের কারনেই তথাকথিত রাষ্ট্রীয় নিয়মের প্রশ্ন তুলেই কঠোর হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার এটি বাস্তবায়ন করছে।
ইতোমধ্যে বাংলাদেশে পুশব্যাকেরও ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালে সুনালি খাতুন নামে এক নারীকে আটক করে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হয়। সে তাৎক্ষণিক তার পরিচয় দেখালেও তাকে জোর পূর্বক পুশব্যাক করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে তার পরিবার আরও বিস্তারিত নথিপত্র প্রদান করলে তাকে ফেরত নিতে বাধ্য হয় দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। বিষয়টি এখনও আদালতে বিচারাধীন বলে সব শেষ জানা গেছে।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!