প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি   ছবি: সংগৃহীত

শিশুদের মধ্যে হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। অনেক অভিভাবক একে সাধারণ জ্বর বা ত্বকে ফুসকুড়ির সমস্যা মনে করলেও বাস্তবে এটি শিশুদের জন্য গুরুতর জটিলতার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল, অপুষ্টি রয়েছে বা টিকা সম্পূর্ণ হয়নি, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

হাম হলে সাধারণত শিশুর জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। এ সময় অনেক শিশুর খাওয়ায় অরুচি, দুর্বলতা ও অস্বস্তিও বাড়তে পারে। চিকিৎসকদের মতে, এই সময়ে সঠিক যত্ন শিশুকে দ্রুত সুস্থ হতে সহায়তা করে, আবার অবহেলা করলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের ভাইরাস শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। ফলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই শুধু জ্বর কমানোর দিকে নজর দিলেই হবে না, শিশুর খাবার, বিশ্রাম, পরিচ্ছন্নতা ও পানিশূন্যতা রোধেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশ্রাম ও আরামদায়ক পরিবেশ জরুরি
হাম হলে শিশুর শরীর অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে। এ কারণে তাকে পর্যাপ্ত বিশ্রামে রাখতে হবে। চিকিৎসকদের পরামর্শ, আক্রান্ত শিশুকে খুব বেশি দৌড়ঝাঁপ বা ক্লান্তিকর কাজে না দিয়ে শান্ত ও আরামদায়ক পরিবেশে রাখা উচিত।

বেশি বেশি তরল খাবার খাওয়ানোর পরামর্শ
জ্বরের কারণে শরীরে পানির ঘাটতি তৈরি হতে পারে। তাই শিশুকে বারবার পানি, ডাবের পানি, স্যুপ, লেবুর শরবতসহ বিভিন্ন তরল খাবার খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। যেসব শিশু বুকের দুধ পান করে, তাদের আরও ঘন ঘন বুকের দুধ খাওয়াতে বলা হয়েছে।

অল্প অল্প করে পুষ্টিকর খাবার
হামের সময় অনেক শিশুর খেতে ইচ্ছা না করলেও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো জরুরি। খাদ্যতালিকায় নরম ভাত, খিচুড়ি, ডিম, সবজি, ফল ও স্যুপ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ খাবারও শিশুর জন্য উপকারী হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

চোখ ও পরিচ্ছন্নতার দিকেও নজর
হামের সময় শিশুর চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং আলোতে অস্বস্তি হতে পারে। এ অবস্থায় ঘরের আলো কিছুটা কম রাখা এবং পরিষ্কার নরম কাপড় দিয়ে চোখ আলতোভাবে মুছে দেওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে শিশুর জামাকাপড়, বিছানা ও ব্যবহার্য জিনিস পরিষ্কার রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস অন্য সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

যেসব ভুল এড়িয়ে চলতে হবে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম হলে অনেক অভিভাবক চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য ওষুধ খাওয়াতে শুরু করেন, যা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া হাম হলে কম খেতে দিতে হয়-এমন ধারণাকেও ভুল বলে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শিশুর সুস্থ হয়ে উঠতে পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন।

জ্বরের সময় পানি কম খাওয়ানোও বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ এতে দ্রুত পানিশূন্যতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে শরীরের ফুসকুড়িতে তেল, পেস্ট বা ভেষজ কিছু লাগানো থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে। এতে ত্বকে জ্বালা বা সংক্রমণ হতে পারে।

হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় আক্রান্ত শিশুকে স্কুল, পার্ক বা জনসমাগমে না নেয়ার পরামর্শও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

যেসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে
চিকিৎসকদের মতে, শিশুর শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, অতিরিক্ত ঝিমিয়ে পড়া, খেতে না পারা, তীব্র ডায়রিয়া, জ্বর অনেক বেড়ে যাওয়া কিংবা ঠোঁট বা শরীর নীলচে হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।

প্রতিরোধে টিকাই সবচেয়ে কার্যকর
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী হাম ও রুবেলার টিকা দিলে এই রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।

তাদের মতে, আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসার পাশাপাশি টিকাদান সম্পর্কে সচেতন হওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, মায়ো ক্লিনিক