জমিদারি নিপীড়নবিষয়ক চিত্র ও প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।
জমিদারি নিপীড়নবিষয়ক চিত্র ও প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।   ছবি: আরটিএনএন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এর ঐতিহাসিক বটতলায় এক ব্যতিক্রমী ‘মুক্তি উৎসব’-এর আয়োজনের মাধ্যমে ৭৬তম জমিদারি প্রথা বিলুপ্তি দিবস পালিত হয়েছে।

বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত এ উৎসবে একদিকে জমিদারি নিপীড়নবিরোধী শহীদ ও বিপ্লবী নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়, অন্যদিকে জমিদারি প্রথার প্রবর্তক লর্ড কর্নওয়ালিস–এর প্রতিকৃতিতে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। জমিদার নিয়োগের মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশের সম্পদ লুট ও পাচারের অভিযোগে ব্রিটেনের বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানানো হয়।

শুক্রবার (১৫ মে) সকাল থেকেই বটতলা প্রাঙ্গণে উৎসবমুখর অথচ গভীর প্রতিবাদের আবহ তৈরি হয়। অনুষ্ঠানে হাতে রক্তের ছাপ এঁকে জমিদারি নিপীড়নবিরোধী শহীদদের স্মরণ করা হয়।

গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয় দুই শতাব্দীব্যাপী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা ও জমিদারি বিরোধী আন্দোলনের নেতা ফকির মজনু শাহ, পণ্ডিত ভবানীচরণ পাঠক, বাবা তিলকা মাঝি, ফকির করম শাহ, টিপু শাহ, জানকুপাথর, দোবরাজপাথর, সৈয়দ মীর নিসার আলী তিতুমীর, হাজী শরীয়তুল্লাহ, মুহাম্মদ মুহসীনউদ্দীন দুদু মিয়া, খুদি মোল্লা, এ কে ফজলুল হক, খাজা নাজিমুদ্দিন এবং মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী–কে।

উৎসবে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে লর্ড কর্নওয়ালিস–এর প্রতিকৃতিতে পাথর নিক্ষেপ করা হয়, যা বাংলাদেশের ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতি তীব্র ঘৃণা ও অসম্মতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানস্থলে জমিদারি নিপীড়নবিষয়ক চিত্র ও প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এতে প্রজাদের ওপর জমিদারদের চাপিয়ে দেয়া ১৮ দফা নিপীড়ন এবং এ জন্য ব্যবহৃত অস্ত্রের তালিকা তুলে ধরা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে আসা ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের তাদের শিক্ষকরা চিত্র ও প্ল্যাকার্ডগুলোর ইতিহাস ব্যাখ্যা করেন। বিশেষ করে ঔপনিবেশিক শাসনামলে সাধারণ মানুষের ওপর জমিদারদের বর্বর অত্যাচারের করুণ ও বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। শিক্ষকদের বর্ণনা শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি উপস্থিত দর্শকদেরও গভীরভাবে নাড়া দেয়।

মুক্তি উৎসবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ১৯০ বছরব্যাপী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শোষণ, নির্যাতন, নিপীড়ন ও দুর্ভিক্ষের ইতিহাস স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান।

এছাড়া বাংলাদেশের জনগণের ওপর নির্যাতনে জড়িত জমিদারদের তালিকা প্রণয়ন করে স্বাধীন দেশে তাদের নামে থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থান ও সড়কের নাম বাতিলের দাবি জানানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে কার্জন হল থেকে লর্ড কার্জন–এর নাম বাদ দেয়ারও তাগিদ দেয়া হয়।

এদিকে ঔপনিবেশিক শাসন জারি করে হত্যা-নির্যাতনের মাধ্যমে সম্পদ লুট এবং জমিদারি ব্যবস্থার নামে বাংলাদেশের জনগণকে ভয়াবহ নির্যাতন-নিপীড়নের মুখে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগে ব্রিটেনকে বিচারের মুখোমুখি করে ক্ষতিপূরণ আদায়ে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

উৎসবে বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের আহ্বায়ক আবদুল ওয়াহেদ ও সহকারী সদস্য সচিব মো. আরিফুল ইসলামের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম, নবাব সলিমুল্লাহ একাডেমীর চেয়ারম্যান আব্দুল জব্বার এবং জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের আহ্বায়ক খোমেনী ইহসান। এ সময় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইয়েদ কুতুব, সহকারী সদস্য সচিব গালীব ইহসান এবং সদস্য মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম ও সাইফুল ইসলাম।

ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম বলেন, জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করার জন্য এ দেশে বহু আন্দোলন হয়েছে। তিতুমীর, হাজী শরীয়তুল্লাহসহ অনেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সর্বশেষ এ কে ফজলুল হক এর নেতৃত্বে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়। তাদের সাফল্য থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে বর্তমানে চালু নব্য জমিদারি প্রথাও বিলুপ্ত করতে হবে। জনপ্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্বসহ কোনো ক্ষেত্রেই জমিদারি চলতে পারে না।

তিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক ও তাদের দোসর জমিদারদেরসহ দেশের অতীতের সব ইতিহাস চর্চার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

আব্দুল জব্বার বলেন, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণ্য ছিলেন জমিদারি প্রথার প্রবর্তক লর্ড কর্নওয়ালিস। তিনি সূর্যাস্ত আইন প্রণয়ন করে মুসলিম জমিদারদের নিঃস্ব করে তাদের হিন্দু নায়েব-গোমস্তাদের হাতে জমিদারি তুলে দিয়েছিলেন।

খোমেনী ইহসান বলেন, জমিদারি প্রথা ছিল শোষণ, নিপীড়ন ও বৈষম্যমূলক। আমাদের পূর্বপুরুষরা ১৯৩ বছর সংগ্রাম করে এ প্রথা উচ্ছেদ করেছেন। একইভাবে চাকরিতে কোটা প্রথাও ছিল বৈষম্যমূলক। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে কোটা প্রথা বাতিল হয়েছে। কিন্তু জনগণ এখনো পুরোপুরি বৈষম্য থেকে মুক্তি পায়নি। চূড়ান্ত ইনসাফ ও মুক্তি পেতে হলে বৈষম্যমূলক বর্তমান সংবিধান, ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্র ও লুটপাটের অর্থনীতি পরিবর্তন করতে হবে।

জমিদারদের নিপীড়নে শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা এবং জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ায় মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ে বিশেষ দোয়া মাহফিলের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি হয়।

এসএস