দলীয় নিয়োগে সয়লাব বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাধান্যে বিএনপিপন্থীরা
দলীয় নিয়োগে সয়লাব বিশ্ববিদ্যালয়।   ছবি: আরটিএনএন

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বরাবরই রাজনৈতিক প্রভাবের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেও পরিবর্তনের চিত্র নতুন নয়। তবে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর উচ্চশিক্ষা প্রশাসনে যে ব্যাপক রদবদল হয়েছে, তা আবারও প্রশ্ন তুলেছে—বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বলয়ের অংশে পরিণত হচ্ছে?

গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক ভিসি, প্রো-ভিসি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তার পদত্যাগ কিংবা অপসারণের ঘটনা ঘটে। পরে এসব পদে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু নতুন নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বড় একটি অংশের রাজনৈতিক পরিচয় সামনে আসায় শিক্ষাঙ্গনে আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশের অভিযোগ, প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে একাডেমিক দক্ষতা ও গবেষণার চেয়ে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন চরিত্র আরও সংকুচিত হবে।

ঢাবি ও ইউজিসিতে পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু:

গত ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভিসি হিসেবে দায়িত্ব নেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তিনি বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে পরিচিত। এর আগে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। বিভিন্ন সময় তাকে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও দেখা গেছে। ২০১৮ সালে বাগেরহাট-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়নপত্র সংগ্রহের তথ্যও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।

একই দিনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান অধ্যাপক মামুন আহমেদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘সাদা দলের’ আহ্বায়ক ছিলেন। পাশাপাশি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানা যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (শিক্ষা) হিসেবে নিয়োগ পাওয়া অধ্যাপক আব্দুস সালামও সাদা দলের বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক। অন্যদিকে প্রো-ভিসি (প্রশাসন) হয়েছেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, যিনি জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

এ ছাড়া ড. ইউনূসের সময় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনপিমনা ভিসি নিয়োগ দেওয়া হলেও, এ সরকার তাদেরকেও পরিবর্তন করেছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ঢাবি ক্যাম্পাসে বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের হয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা গেছে সদ্য সাবেক প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদকে। তিনি সংগঠনটির প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলেও জানা গেছে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর থেকেই তাকে পরিবর্তন করার গুঞ্জন চলছিল। বর্তমানে তার জায়গায় প্রক্টর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. ইসরাফিল।

অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও একই চিত্র:

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাম্প্রতিক নিয়োগগুলোতেও বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের প্রাধান্যের অভিযোগ উঠেছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া অধ্যাপক মো. ফরিদুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভিসি অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-ফোরকান জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সিনিয়র সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক রইস উদ্দিন শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাদা দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক এ কে এম মতিনুর রহমানও বিএনপিপন্থী শিক্ষক রাজনীতির পরিচিত মুখ।

এ ছাড়া কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক নিয়োগ নিয়েও একই ধরনের আলোচনা রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন প্রশাসনিক নিয়োগের প্রস্তুতি চলছে।

‘সরকার বদলায়, সংস্কৃতি বদলায় না’:

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে দলীয় প্রভাবের বিষয়টি নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় প্রতিটি সরকারই নিজেদের ঘনিষ্ঠ শিক্ষকদের প্রশাসনিক দায়িত্বে বসিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের চেহারাও বদলে যায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। অনেকেই বলছেন, আগে আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষকদের প্রাধান্য ছিল, এখন সেই জায়গায় বিএনপিপন্থীরা আসছেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক সংস্কৃতি একই থাকছে, শুধু পক্ষ বদলাচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের একাংশের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে ক্যাম্পাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে বিরোধী মতের শিক্ষার্থীরা চাপে পড়তে পারেন।

শিক্ষা ও গবেষণায় প্রভাবের আশঙ্কা:

বিশ্ববিদ্যালয়কে সাধারণত স্বাধীন জ্ঞানচর্চার জায়গা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু শিক্ষাবিদদের অনেকে মনে করেন, প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বাড়লে গবেষণা ও একাডেমিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন—এমন কয়েকজন শিক্ষক বলেন, একজন শিক্ষকের রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতেই পারে। কিন্তু প্রশাসনিক নিয়োগে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত তার গবেষণা, নেতৃত্বদক্ষতা ও একাডেমিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর।

তাদের মতে, প্রশাসনের রাজনৈতিক পরিচয় যত বেশি সামনে আসে, তত বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে বিভাজন তৈরি হয়। এতে শিক্ষকদের মধ্যেও মেরুকরণ বাড়ে এবং শিক্ষার্থীদের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

শিক্ষাবিদরা কী বলছেন?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন মনে করেন, সমস্যার মূল কাঠামোগত। তার ভাষায়, “যতদিন ভিসি নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব থাকবে, ততদিন শিক্ষক নিয়োগ থেকেও রাজনীতি দূর হবে না।”

তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য আলাদা কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়ে বলেন, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন সার্চ কমিটি গঠন করা গেলে তুলনামূলক যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে।

শিক্ষাবিদ ড. মনসুর আহমেদের মতে, “বিশ্ববিদ্যালয় শুধু প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়, এটি জ্ঞান উৎপাদনের জায়গা। সেখানে রাজনৈতিক পরিচয় যদি প্রধান বিবেচনায় পরিণত হয়, তাহলে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকও মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দলীয়করণ গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।

সরকারের অবস্থান কী?

তবে সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক বলেন, “রাজনীতি করা কোনো অপরাধ নয়। একজন শিক্ষক রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করতেই পারেন।”

তার দাবি, নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গবেষণা, একাডেমিক যোগ্যতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিবেচনা করা হয়েছে। কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তবে সমালোচকদের প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তিদের ধারাবাহিক নিয়োগ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীন ভাবমূর্তিকে কতটা প্রভাবিত করবে?

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা এখন সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।