বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব আল্লামা মামুনুল হক।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব আল্লামা মামুনুল হক।   ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা আব্দুল মালেকের সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব আল্লামা মামুনুল হক। তিনি বলেছেন, মাওলানা আব্দুল মালেক তার ঘনিষ্ঠ উস্তাদ এবং নিজের জ্ঞান ও যোগ্যতা অর্জনের ক্ষেত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তবে চলমান বিশ্বব্যবস্থা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি, সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থার মতো বিষয়ে তিনি মাওলানা আব্দুল মালেকের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেননি। ফলে এসব ক্ষেত্রে তাকে পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করেন না বলেও জানিয়েছেন তিনি।

বুধবার (৭ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে মামুনুল হক এসব কথা বলেন।

স্ট্যাটাসের শুরুতে মাওলানা আব্দুল মালেকের ইলমি অবদানের প্রশংসা করে মামুনুল হক বলেন, তিনি শুধু বাংলাদেশের একজন শীর্ষ আলেম নন, তার দৃষ্টিতে একজন ক্ষণজন্মা ও অতুলনীয় ইলমি ব্যক্তিত্ব। সমকালে তার মতো গভীর ও বিস্তৃত জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তি খুব বেশি দেখা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মামুনুল হক বলেন, মাওলানা আব্দুল মালেক তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে ইলমি খেদমত করে আসছেন। উচ্চতর গবেষণামূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মাধ্যমে তিনি দেশের ইলমচর্চাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তার মতে, মাওলানা আব্দুল মালেকের ইলমি খেদমতের আগে ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের ইলমচর্চা অনেকটা পিছিয়ে ছিল। বর্তমানে কোনো কোনো বিবেচনায় বাংলাদেশের ইলমচর্চা ভারত ও পাকিস্তানের চেয়েও এগিয়ে গেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

‘মাওলানা আব্দুল মালেক আমার খাস উস্তাদ’

নিজের সঙ্গে মাওলানা আব্দুল মালেকের সম্পর্কের বর্ণনা দিতে গিয়ে মামুনুল হক বলেন, তিনি তার খাস উস্তাদ। সরাসরি তার প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে নিয়মিত ছাত্র হতে না পারলেও বিশেষ বিবেচনায় তার শিষ্যত্ব গ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন।

তিনি জানান, ২০০২-০৩ সালের দিকে মোহাম্মদপুরের বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন এলাকায় মারকাযুদ দাওয়াহর কার্যক্রম চলার সময় তিনি সাত মসজিদসংলগ্ন জামিয়া রাহমানিয়ায় শিক্ষকতা করতেন। সে সময় প্রায় দেড় বছর মাওলানা আব্দুল মালেকের ছাত্র হিসেবে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ পান।

মামুনুল হক বলেন, সে সময় মাওলানা জাকারিয়া আবদুল্লাহ ও মাওলানা আনিসুর রহমান মারকাযুদ দাওয়াহর উলূমুল হাদিস বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তিনি মাওলানা আব্দুল মালেকের অনুমতি নিয়ে তাদের সঙ্গে দরসে অংশ নিতেন এবং ক্লাসের বাইরেও মুতালাআর বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা নিতেন।

তিনি জানান, নিয়মিতভাবে মাওলানা আব্দুল মালেকের কাছে তিনি দুটি দরসে অংশ নিতেন। এর একটি ছিল ‘মুকাদ্দিমায়ে ইবনুস সালাহ’, যা তিনি পুরো বছর ধারাবাহিকভাবে পড়িয়েছেন। এর মাধ্যমে উলূমুল হাদিসের প্রাথমিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পান তিনি।

অন্য দরসটি উলূমুল হাদিস ও উলূমুল ফিকহ -দুই বিভাগের সমন্বয়ে পরিচালিত হতো। সেখানে তিন সেমিস্টারে তিনটি কিতাব পড়ানো হয়। এগুলো হলো ‘ফিকহু আহলিল ইরাক ওয়া হাদীসুহুম’, ‘আসারুল হাদীসিশ শরীফ ফি ইখতিলাফিল আইম্মাতিল ফুকাহা’ এবং ‘আর-রাফউ ওয়াত-তাকমীল’।

মামুনুল হক বলেন, এভাবে চারটি কিতাব ও চারটি বিষয়ে দীর্ঘ সময় সরাসরি দরস নেওয়ার মাধ্যমে মাওলানা আব্দুল মালেকের কাছ থেকে তিনি শিক্ষা লাভ করেছেন। এ কারণে নিজের শিক্ষার ভিত গড়ে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষকদের মধ্যে মাওলানা আব্দুল মালেককে অন্যতম হিসেবে গণ্য করেন তিনি।

‘আমার ইলমি অস্তিত্বের অন্যতম প্রধান ভিত্তি তিনি’

নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যায় মামুনুল হক বলেন, তার যতটুকু যোগ্যতা ও জ্ঞান অর্জনের সুযোগ হয়েছে, তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি ও স্তম্ভ মাওলানা আব্দুল মালেক।

তিনি বলেন, “মাওলানা আব্দুল মালেক হাফিজাহুল্লাহ যেহেতু আমার এমন ঘনিষ্ঠ এবং ইলম ও জ্ঞানের ভিত্তি স্থাপনের বুনিয়াদ হিসেবে রয়েছেন, কাজেই তার ইলম, শিক্ষা এবং তার চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি আমি যদি কখনো অকৃতজ্ঞ হই, তাহলে আমি নিজেই নিজের প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়ে যাব।”

মামুনুল হক আরও বলেন, তিনি মাওলানা আব্দুল মালেককে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, ইলমের গভীরে নিমগ্ন, কিতাবের পাতায় বিচরণকারী, দুনিয়াবিমুখ, নির্মোহ ও নির্লোভ একজন মহান সাধক হিসেবে পেয়েছেন। বর্তমান সময়ে তার মতো ব্যক্তিত্বের দৃষ্টান্ত পাওয়া কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

‘রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করিনি’

তবে রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার মতো বিষয়ে নিজের অবস্থান আলাদাভাবে তুলে ধরেছেন মামুনুল হক।

তিনি বলেন, “চলমান বিশ্বব্যবস্থা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতি, সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থা -ইত্যকার বিষয়গুলোতে আমি মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের শিষ্যত্ব গ্রহণ করিনি। তাই এ বিষয়গুলোতে আমি ওনাকে পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করতে পারি না।”

এসব বিষয়ে বর্তমানে যাদের শিক্ষকতুল্য অভিভাবকত্ব রয়েছে, তাদের মধ্যে মাওলানা লিয়াকত আলীর ওপর তিনি সবচেয়ে বেশি আস্থা রাখেন বলেও জানান।

‘আমার ব্যাপারে কঠোর কথা বলার অধিকার তার রয়েছে’

মামুনুল হক বলেন, নিজের ইলমি অস্তিত্বের প্রতিটি কণার জন্য তিনি মাওলানা আব্দুল মালেকের কাছে ঋণী। এ প্রসঙ্গে হজরত আলী (রা.)-এর নামে প্রচলিত একটি উক্তি উদ্ধৃত করেন তিনি—“যার কাছ থেকে একটি অক্ষরের জ্ঞানও শিখেছি, আমি তার গোলাম...।”

এই বক্তব্যের ব্যাখ্যায় মামুনুল হক বলেন, একজন শিক্ষকের কাছ থেকে একটি অক্ষর জ্ঞান অর্জনেরও যদি এত বড় হক থাকে, তাহলে তার নিজের ওপর মাওলানা আব্দুল মালেকের আরও বড় হক ও অধিকার রয়েছে।

এ কারণে তার ব্যক্তি সম্পর্কে মাওলানা আব্দুল মালেক কঠোর বা কড়া কথা বলার অধিকার রাখেন বলে মনে করেন মামুনুল হক।

‘নেতিবাচক মন্তব্য করা শিষ্টাচারবহির্ভূত’

মামুনুল হক আরও বলেন, তার বিষয়ে মাওলানা আব্দুল মালেকের কোনো কঠোর বা কঠিন মন্তব্যের পর তৃতীয় কোনো ব্যক্তি এসে নেতিবাচক মন্তব্য করলে তিনি সেটিকে শিষ্টাচারবহির্ভূত মনে করেন।

তিনি বলেন, “আমার ব্যাপারে মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের কঠোর অথবা কঠিন কোনো মন্তব্যে উপযাচক হিসেবে কেউ এসে কোনো ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য করাটা আমি শিষ্টাচারবহির্ভূত মনে করি।”

মাওলানা আব্দুল মালেকের ইলম, আমল, ইখলাস, দুনিয়াবিমুখতা ও নির্মোহতার মতো গুণাবলি নিয়ে কেউ নেতিবাচক মন্তব্য করলে তাকে অজ্ঞ, মূর্খ এবং ক্ষেত্রবিশেষে সীমালঙ্ঘনকারী বলা ছাড়া আর কোনো মন্তব্য করার নেই বলেও নিজের অবস্থান জানান মামুনুল হক।

স্ট্যাটাসের শেষাংশে তিনি বলেন, বিষয়টি সবাই নিজ নিজ সীমার মধ্যে থেকে অনুধাবন করবেন-এটাই তার প্রত্যাশা।