রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ইসলামী ছাত্রশিবির আয়োজিত ‘তারুণ্যের বাজেট ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে তরুণবান্ধব, কর্মসংস্থানমুখী ও বৈষম্যহীন করার দাবি জানানো হয়েছে। বক্তারা বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাড়তে থাকা বেকারত্ব ও ঋণনির্ভর অর্থনীতি দেশের তরুণ সমাজকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং স্বচ্ছ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বুধবার (১৩ মে) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা। এতে অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও সাবেক ছাত্রনেতারা অংশ নেন।
সেমিনারে ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তারুণ্যের ভাবনা: ইসলামী মূল্যবোধ ও উন্নয়ন কৌশল’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজের (সিএসপিএস) নির্বাহী পরিচালক ড. মো. মিজানুর রহমান।
মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে নিম্ন প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির এক কঠিন রূপান্তরকাল অতিক্রম করছে। ২০২৫ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৫ শতাংশে নেমে আসা এবং যুব বেকারত্বের হার ১১.৫ শতাংশে পৌঁছানো দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ড. মো. মিজানুর রহমান বলেন, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগাতে শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একইসঙ্গে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সুদমুক্ত অর্থায়ন ও যাকাত-ওয়াকফভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।
সেমিনারে আলোচনায় অংশ নিয়ে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. ওয়ারেসুল করিম দেশের আর্থিক খাতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দেশের রাষ্ট্রীয় ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে এবং প্রতি বছর প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা করে ঋণের বোঝা বাড়ছে। ব্যাংক খাতে সাড়ে ১৮ লাখ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকাই খেলাপি ঋণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। একইসঙ্গে অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই) দুরবস্থা, অবকাঠামো খাতে দুর্নীতি ও জবাবদিহিতার অভাবের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তরুণদের মেধা পাচার রোধে কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়নে কার্যকর পরিকল্পনার আহ্বান জানান ড. ওয়ারেসুল করিম।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. শিব্বির আহমেদ বলেন, দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যেই কমে আসবে। তাই এখনই দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং আইসিটি ও কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি বলেন, বাজেটে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বরং অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। দক্ষ জনবল ছাড়া অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় বাড়ায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, দেশের তরুণ সমাজ বর্তমানে মাদকাসক্তি, বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তার মতো বড় সংকটের মুখোমুখি। তিনি বলেন, প্রতিদিন দেশে প্রায় ২০ কোটি টাকার মাদক সেবন হচ্ছে, যা তরুণ সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। একইসঙ্গে দেশে তরুণ বেকারত্ব ক্রমেই বাড়ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, তরুণদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তন এলেও তাদের প্রত্যাশিত সংস্কার ও কর্মসংস্থানের প্রতিফলন এখনো দৃশ্যমান নয়। সংবিধান, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও দুর্নীতি দমন খাতে কার্যকর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ব্যক্তি ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংস্কৃতির পরিবর্তে তরুণদের জাতীয় উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার দিকে মনোযোগী করতে হবে। তিনি বলেন, “দেশের চেয়ে ব্যক্তি বা ক্ষমতার পেছনে ছুটলে উন্নয়ন সম্ভব নয়। দেশের সুযোগ ও দক্ষতা উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।” তিনি জুলাই আন্দোলনে তরুণদের আত্মত্যাগ স্মরণ করে শহীদ ও আহত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং তাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানান। একইসঙ্গে বৈষম্যহীন ও জবাবদিহিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
সেমিনারের সভাপতি ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম তাঁর সমাপনী বক্তব্যে বলেন, জুলাই আন্দোলনে তরুণদের আত্মত্যাগের মাধ্যমেই দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। তাই রাষ্ট্র পরিচালনা ও বাজেট প্রণয়নে তরুণদের ভাবনা ও চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে বৈষম্যমূলক অর্থনীতি, ঋণনির্ভর উন্নয়ন ও দুর্নীতিনির্ভর প্রকল্প দেশের অর্থনীতিকে সংকটের মুখে ফেলেছে। তিনি বলেন, দেশের অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে অধিকাংশ সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে, অথচ সাধারণ মানুষ ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও করের চাপে বিপর্যস্ত।
সেমিনারের সভাপতি ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম তাঁর সমাপনী বক্তব্যে জুলাই বিপ্লবের প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে গঠিত এই নতুন গণতান্ত্রিক সরকার যে রক্তের বিনিময়ে এবং তরুণদের আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে গঠিত হয়েছে, তা যেন তারা কোনোভাবেই ভুলে না যায়। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, যে তরুণদের আন্দোলনের ফলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ফিরে এসেছে, তাদের অবদানকে বাজেটে বা রাষ্ট্র পরিচালনায় উপেক্ষা করা হলে সরকার নিজেদের অস্তিত্বই সংকটে ফেলবে।
দেশের ক্রমবর্ধমান আয় বৈষম্য ও লুটপাটের রাজনীতি নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মাত্র ২০ শতাংশ মানুষ আজ ৯০ শতাংশ সম্পদ জিম্মি করে রেখেছে। বিগত সময়ে এস আলম বা বেক্সিমকোর মতো বড় বড় গ্রুপগুলো ব্যাংক লুট করে বিদেশে টাকা পাচার করেছে, অথচ সাধারণ রিকশাচালককেও ভ্যাট দিতে হচ্ছে। তিনি নবনির্বাচিত সরকারকে লুটপাটের পথ চিরতরে বন্ধ করে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অর্থ কাঠামো গড়ার আহ্বান জানান।
কেন্দ্রীয় সভাপতি তাঁর বক্তব্যের শেষ অংশে নবনির্বাচিত সরকারের প্রতি সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জুলাই বিপ্লবের শহীদ, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী বীর সন্তানদের কল্যাণে এবং তাদের পরিবারের পুনর্বাসনে বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। একে তিনি বর্তমান সরকারের একটি নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের আমূল পরিবর্তন চেয়ে তিনি প্রস্তাব করেন যে, ইউনেস্কোর গাইডলাইন অনুযায়ী শিক্ষা খাতে জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ বরাদ্দ দিতে হবে। একইসাথে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে এবং সরকারি হাসপাতালের আধুনিকায়ন ও সেবার মান বাড়াতে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ন্যূনতম ৫ শতাংশ বরাদ্দের দাবি জানান তিনি। এছাড়াও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে তিনি ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ সুবিধাকে কাজে লাগানোর প্রস্তাব দেন।
পরিশেষে তিনি ঘোষণা করেন যে, তরুণদের এই ভাবনাগুলো একটি শিক্ষাবান্ধব বাজেট প্রস্তাবনা আকারে শিগগিরই অর্থ মন্ত্রণালয়ে পেশ করা হবে।
সেমিনারে অন্যান্যদের মধ্যে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, মিডিয়া সম্পাদক মু'তাসিম বিল্লাহ শাহেদী, প্রকাশনা সম্পাদক আমিরুল ইসলাম, বায়তুলমাল সম্পাদক আনিসুর রহমান, গবেষণা সম্পাদক ফখরুল ইসলাম, প্রচার সম্পাদক ও ডাকসু জিএস এস এম ফরহাদ, ছাত্রকল্যাণ সম্পাদক রেজাউল করিম শাকিল এবং কেন্দ্রীয় স্পোর্টস সম্পাদক মুশফিকুর রহমানসহ কেন্দ্রীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!