সংরক্ষিত মহিলা আসনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম, একান্ত সাক্ষাৎকার
সংরক্ষিত মহিলা আসনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম।   ছবি: আরটিএনএন

রোকেয়া বেগম। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য। তবে এ পরিচয়কে ছাপিয়ে তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন জুলাইয়ের শিশু শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা হিসেবে। জুলাই শহীদ পরিবারের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাঁকে মনোনীত করেছে এমপি হিসেবে। বিশেষ সাক্ষাৎকারে আরটিএনএন’র মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেছেন তাঁর অনুভূতি, জুলাই নিয়ে তাঁর চিন্তা, ভবিষ্যত কর্মসুচিসহ অনেক কিছু। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আরটিএনএন’র নির্বাহী সম্পাদক অরণ্য গফুর। পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হচ্ছে পুরো সাক্ষাৎকারটি।

আরটিএনএন: সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে কেমন লাগছে? বিশেষ করে ৫০ জনের মধ্যে আপনিই একমাত্র সরাসরি জুলাই প্রতিনিধি।

রোকেয়া বেগম: এটা তো আসলে কেমন লাগার ব্যাপার না। এত বড় একটা দায়িত্ব আমি এত সাহসিকতার সাথে নিয়েছি যেটা আমার কাছে এখন মনে হচ্ছে যে, যদি আমি আমার শহীদ পরিবার এবং আহত যোদ্ধাদের জন্য কিছু করতে পারি, তখনই আমার অনুভূতিটার আসলে প্রকাশটা ভালো হবে। এছাড়া আমাদের তো আসলে অনুভূতি সেরকম কিছু না। আমার ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে সারাদিনইতো একটা যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। তো আমি যখন আমার শহীদ পরিবার এবং আহত যোদ্ধাদের নিয়ে কিছু করতে পারবো তখনই আমি আসলে ভালো আছি বা ভালো থাকব মনে করব।

আরটিএনএন:  মাতৃস্নেহের বড় অংশ উপভোগের আগেই শহীদ হয়ে জাবের মাকে বড় সম্মান উপহার দিল- একদিকে শহীদের মা, অন্যদিকে সংসদ সদস্য। এ অনুভূভি কতটা নাড়া দেয়?

রোকেয়া বেগম: ধন্যবাদ যে, আমাদের শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে উনারা আমাকে নির্বাচিত করেছেন। এবং আমাকে এরকম একটা প্লাটফর্মে দাঁড় করিয়েছেন যে যেখানে আমি হয়তো শহীদ পরিবারের জন্য কিছু করার অঙ্গীকার রাখছি। কিন্তু সন্তান হারানোর ব্যথা কোনভাবেই আসলে আমাকে কাউকে কোন কিছু দিয়ে তৃপ্তি রাখতে দিতে পারে না। বা দিতে পারবেও না। আমার কাছে মনে হয় যে আমার বাচ্চাটা যদি আমার কাছে থাকতো সেটাই হয়তো আমার ভালো অনুভূতি হতো। জানিনা হয়তো অনেক কঠিন সময় আমাকে পার হতে হবে। আমি চাচ্ছি যে বাংলাদেশের মানুষ আমাকে সহযোগিতা করবে এবং আমি শহীদ পরিবার এবং যোদ্ধাদের জন্য কিছু করার অঙ্গীকার রাখছি।

সাক্ষাৎকার গ্রহণের একটি মুহূর্তে রোকেয়া বেগম ও আরটিএনএন’র নির্বাহী সম্পাদক

আরটিএনএন: জুলাই শহীদের মা হিসেবে সংসদে যাওয়া, বাড়তি দায়িত্বের বোঝা কিনা?

রোকেয়া বেগম: আপনি একটা জিনিস মনে রাখবেন, যে শহীদ পরিবারগুলো আছে এখনো অনেকেরই গেজেট হয়নি। আহত যোদ্ধা এখনো চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভালো চিকিৎসা পাচ্ছে না। তো সেইগুলো আমি দেখেছি। যদিও আমি রাস্তায় নাই। তবুও জাবিরের বাবা সবসময় রাস্তায় আছে এবং সেগুলো আমি শেয়ার করে আমার সাথে আমি জানি। তো এই যে একটা ব্যাপার, যে এখনো আমার শহীদ পরিবারের মানুষজন ডিপ্রাইভ। সেগুলো আসলে মেইনটেইন করা আমার কাছে একটু বাড়তি চাপই মনে হচ্ছে। যদি আমি সহযোগিতা পাই তাহলে হয়তো আমার জন্য পথ চলাটা সহজ হবে।

আরটিএনএন:  অনেকে জুলাইকে শুধু আবেগ আবার অনেকে জুলাই ব্যবসা বলে- জুলাইয়ের বাস্তবতাকে অবজ্ঞা বা অস্বীকার করতে চাইছে। সংসদ সদস্য হিসেবে আপনি এখন তাদেরও প্রতিনিধি। সে হিসেবে এ বক্তব্যকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

রোকেয়া বেগম: আসলে জুলাইকে অবজ্ঞা করার বা অস্বীকার কোন করার কোন উপায় নেই। যদি উনারা করে থাকেন এটা আসলে উনারা ভুল কথা বলছেন। আমি মনে করি যে, এই যে ছোট ছোট বাচ্চারা জীবন দিয়েছে তাদের বিনিময়ে ওনারা এখন বাংলাদেশে কথা বলতে পারছেন, আমরা সহজভাবে সাধারণভাবে চলাফেরা করতে পারছি। ওনাদের মত মানুষ যদি এখন এভাবে জুলাইকে অস্বীকার করে, রক্তের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া সংসদে বসে উনারা কথা বলে যদি জুলাইকে অস্বীকার করে, তাহলে আসলে এটা দুঃখজনক ছাড়া আর কিছু না। এটা অবশ্যই দুঃখজনক।

আরটিএনএন: আমরা অতীতে আবেগ নিয়ে অনেক কাণ্ডকাহিনী দেখেছি। সেখানে থেকে জুলাই শহীদের মা এবং সংসদ সদস্য- দুই পরিচয়ে আবেগ ও পেশাদারিত্বের ভারসাম্য বজায় রাখা কতটা চ্যালেঞ্জিং হবে মনে করছেন?

রোকেয়া বেগম: আবেগ তো থাকবেই আমার বাচ্চা যেহেতু জীবন দিয়েছে, সেটা তো থাকবেই। কিন্তু তাদের যে আত্মত্যাগ সে ত্যাগটা আমাদেরকে স্বীকার করেই সামনে আগাতে হবে এবং এটা মনে রাখতে হবে যে, আমরা তাদের রক্তের দিয়ে উপর দিয়ে এখন কাজ করছি, কথা বলছি। আবেগ এবং পেশাদারিত্বটার সমন্বয় অবশ্যই লাগবে, না হলে আমি আসলে সামনের দিকে আগাতে পারবো না। আমার পেশাদারিত্ব থাকবে, আমার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করেই আমার যেটা করণীয় সেটা আমাকে করতেই হবে। কিন্তু মানে এই না যে অস্বীকার করে আমি সবকিছু আবার সেই আগের মত ফ্যাসিবাদীর দিকে চলে যাবো, সেটা তো আসলে হওয়ার না। তো আপনাকে আমি বলতে চাচ্ছি যে, পেশাদারিত্ব এবং আবেগ দুইটা সমন্বয় অবশ্যই জরুরী।

আরটিএনএন: সংসদে আপনার অগ্রাধিকার কী হবে? কোন ইস্যুগুলো নিয়ে কাজ করতে চান?

রোকেয়া বেগম: ১৪শ’ জুলাই পরিবার আর প্রায় ৩০ হাজার আহত যোদ্ধা যাদের সমস্যা পাহাড়সম, তাদের সমস্যাগুলো যে আপনি জড় করেন একসাথে সেটা বিশাল ব্যাপার। তো আমি আসলে ফোকাস দিব ওখানেই যে আমার শহীদ পরিবারের যে মা আছে, বোন আছে, স্ত্রীরা আছে তারা অনেক কষ্টে আছে। আমি প্রথমেই তাদের কথা শুনব; তাদের নিয়ে কাজ করব। তারপরও যদি অন্য কিছু করতে হয় তাহলে তো করতেই হবে। এটা আমি মনে করছি আর কি। আসলে সবকিছু তো আর একদিকে নিয়ে যাওয়া যাবে না। যদি অন্য কাঠামোগত কাজ করতে হয় সেটাও তো করতে হবে।

আরটিএনএন: জুলাইয়ের শরীকদের মধ্যে বিভাজন ও প্রতিপক্ষের নানা ষড়যন্ত্রে জুলাই অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে জুলাইয়ের অগ্রসৈনিক তরুণদের জন্য আপনার বার্তা কী হবে?

রোকেয়া বেগম: আপনি ঠিকই বলেছেন যে, এখন অনেকগুলো দলে ভাগ হয়ে গেছে জুলাই পরিবার, জুলাই যোদ্ধারা। তো আমি এই তরুণ সমাজ যারা রক্ত দিতে দ্বিধা করেনি, সেই তরুণ সমাজ আজকে দ্বিধাবিভক্ত হওয়াটা উচিত না। তো আমি চাইবো এই জুলাই যোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের যারা সদস্য আছে তারা সবাই এক হবে। একসাথে জুলাইকে বাঁচানোর জন্য কাজ করবে এবং নিজেকে ওইভাবে সম্পদ হিসেবে তৈরি করবে। এটাই তাদের এখন মূল কাজ এবং সবাই একত্রিত হয়ে জুলাইকে বাঁচাবে এটাই আমি সমাজের কাছে চাই।

৫ আগস্ট উত্তরায় শহীদ হয় ৫ বছরের শিশু জাবির ইব্রাহিম।

আরটিএনএন: মৌলিক সংস্কারে সরকারের অবস্থান ধোয়াশায় আচ্ছন্ন। সেক্ষেত্রে জুলা্ইয়ের আকাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র বিনির্মাণ সম্ভব কিনা বা হলেও কতটা বেগ পেতে হবে?

রোকেয়া বেগম: আসলে লড়াই তো করতেই হবে। প্রথম থেকেই তো আমরা লড়াই করছি। একাত্তরে  যেরকম একটা লড়াই ছিল আমাদের স্বাধীনতার জন্য। ২৪-এ যে লড়াইটায় অনেক মানুষ জীবন দিয়েছে। তো ২৪-এর লড়াইটা ছিল আমাদের সার্বভৌমত্বের লড়াই। তো এই লড়াইটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য আমাদের মনে হয় আরো বেশি লড়াই করতে হবে। আমার কাছে মনে হচ্ছে বেশিরভাগ মানুষই তো লড়াইয়ের পক্ষে। তো আমি আশাবাদী অবশ্যই উনারা এটাকে একটা সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য। আমার মনে হয় এই লড়াইটাকে খুব বেশি এগোতে দেওয়া ঠিক হবে না। এতগুলো মানুষ, এতগুলো বাচ্চা জীবন দিয়েছে, সেই লড়াইটা আমাদেরকে এভাবেই চালিয়ে যেতে হবে, এটা আমার কাছে ঠিক মনে হচ্ছে না। তো আমি আসলে চাইবো যে লড়াইটা থেমে যাক। আমরা একটা সুন্দর বাংলাদেশ চাই। একটা সুন্দর বাংলাদেশ সবাই মিলে, কোন দল না। রাজনীতির ঊর্ধ্বে গিয়ে আমরা একটা সুন্দর বাংলাদেশ গড়ি।

আরটিএনএন: সংরক্ষিত আসনে মাত্র ১১টি আসন পাওয়ার পরও জুলাই শহীদের পরিবারকে সংসদ সদস্য করার জামায়াতে ইসলামীর অবস্থানকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

রোকেয়া বেগম: আমি আসলে উনাদেরকে (জামায়াতে ইসলামী) ধন্যবাদ জানাই। মানে কৃতজ্ঞতা জানাই এইজন্য যে শহীদ পরিবারকে উনারা সম্মান দিয়েছেন। শহীদ পরিবারকে উনারা ধারণ করেছেন। যার জন্য আমি উনাদেরকে ধন্যবাদ জানাই। আসলে জামাতে ইসলামী পক্ষ থেকে আমাকে মনোনীত করা মানেই হলো শহীদ পরিবারকে মনোনীত করা। শহীদ পরিবারে হয়ে কথা বলা। শহীদ পরিবারে হয়ে কথা না বলতে পারার কারণে অনেক শহীদ পরিবারই এখনো ডিপ্রাইভ। যার জন্য উনারা চেয়েছেন আমি ওনাদেরকে এজন্য ধন্যবাদ জানাই।

আরটিএনএন: কৃতজ্ঞতা বোধ বা রাজনীতির কারণে অনেক সময় আপোস করতে হয়, সেই জায়গা থেকে সংসদের কোনো ব্যাপারে জামায়াতের সঙ্গে আপনার মতবিরোধ হলে তখন কী করবেন?

রোকেয়া বেগম: এটা আসলে মনে রাখবেন যে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। ওনারা শহীদ পরিবারকে সম্মান করেছে। ব্যাপারটা এমন না যে আমি সংগঠনের সাথে জড়িত। উনারা শহীদ পরিবার থেকে নিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী পরিবার থেকে তো নয়। তো শহীদ পরিবার থেকে যদি নিয়ে থাকে তাহলে উনারা সম্মান দিয়েছেন সে সম্মান রক্ষা করাটা আমার নৈতিক দায়িত্ব। সেটা ঠিক আছে। কিন্তু যখন আমার শহীদ পরিবারের বিরুদ্ধে উনারা কিছু বলবেন বা কিছু করতে বলবেন, সেটা তো আমার নীতিগতভাবেই আমি এটা করবো না। মানে এটা তো করা উচিত হবে না। আমি তো শহীদ পরিবার হয়ে ওখানে গিয়েছি। এটা আসলে আমি মনে করি হয়তো উনারা ওটা চাইবেও না। আমার কাছে এটা মনে হচ্ছে আর যে শহীদ পরিবারে কিছু খারাপ কিছু হবে সেটা তো আর উনারা চাইবেন না। বা আমার কাছেও সেটা উনি আশা করবেন না। আমার নীতিটা তো ঠিক থাকবে। আমি কি চাই সেটা তো অবশ্যই আমারটা ঠিক থাকবে।

আরটিএনএন: একজন সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্বপালনে দেশবাসীর কাছে আপনার কোনো প্রত্যাশা বা বার্তা আছে কিনা?

রোকেয়া বেগম: অবশ্যই আমি দেশবাসীর কাছে চাইবো উনারা আমার জন্য দোয়া রাখবেন যেন আমি শহীদ পরিবার হয়ে কিছু করতে পারি। আমার আহত যোদ্ধা জুলাই যোদ্ধাদের জন্য যেন কিছু করতে পারি। ওনাদের সহযোগিতা চাইব।

আরটিএনএন: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

রোকেয়া বেগম: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।

">