২০২৪ সালের জুলাই মাসের উত্তাল দিনগুলোতে যে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ স্বৈরাচারের লৌহকঠিন দেয়াল চূর্ণ করে গণঅভ্যুত্থানের সূচনা করেছিল, আজ সেই ঐতিহাসিক প্ল্যাটফর্মটিই নিজের অস্তিত্ব সংকটের মুখে। একদিকে শীর্ষ নেতৃত্বের জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ, অন্যদিকে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে ‘উপদেষ্টা পর্ষদ’ গঠন, মাঝে নেতৃত্ব নিয়ে নানা অভিযোগ- সব মিলিয়ে সংগঠনটি তার অরাজনৈতিক ও নিরপেক্ষ সত্তা হারিয়ে রাজনৈতিক দলের ‘লিয়াজোঁ’ বা অঙ্গসংগঠনে পরিণত হওয়ার অভিযোগে বিদ্ধ হচ্ছে। ফলে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছন অনেক নেতাকর্মী।
আন্দোলনের সূচনালগ্ন; এক অনবদ্য ইতিহাস
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে কোটা সংস্কারের দাবিতে যে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল, তা দ্রুতই সারাদেশের ছাত্রসমাজের হৃদস্পন্দনে পরিণত হয়। আবু সাঈদের মতো অকুতোভয় শহীদের রক্ত এবং ‘বাংলা ব্লকেড’-এর মতো কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এই আন্দোলন শুধু দাবির লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা একটি পূর্ণাঙ্গ গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ৫ আগস্ট স্বৈরাচারের পতন নিশ্চিত করে বাংলাদেশ নতুন দিগন্তের সূচনা করে, যার অগ্রভাগে ছিল এই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
আদর্শ বিচ্যুতি; লেজুড়বৃত্তির অভিশাপ
এই আন্দোলনের ভিত্তি ছিল সংস্কারমুখী চেতনা। সংগঠনের ৯ দফা দাবির অন্যতম ছিল- ‘সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে দ্রুততম সময়ে নিয়মিত ছাত্র সংসদ কার্যকর করতে হবে।’ যে ছাত্রনেতারা ছাত্ররাজনীতিকে উর্ধ্বতন দলের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার শপথ নিয়ে রাজপথ কাঁপিয়েছিলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপট তার ঠিক উল্টো চিত্র তুলে ধরছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠনের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-তে যোগদানের ফলে প্ল্যাটফর্মটি কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে। এই রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। আবার এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ চেষ্টার অভিযোগও তরতাজা। সমালোচকদের মতে, যারা একসময় রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির বিরোধিতা করেছিলেন, তারাই এখন জাতীয় নাগরিক পার্টির এজেন্ডা বাস্তবায়নে মরিয়া- যা তাদেরই নিজস্ব গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী।
‘পকেট কমিটি’ ও বিতর্কিত উপদেষ্টা পর্ষদ
সংকট ঘনীভূত হয় এ বছরের ১৯ এপ্রিল, যখন এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করে ৫ সদস্যের একটি ‘উপদেষ্টা পর্ষদ’ ঘোষণা করা হয়। যদিও বিজ্ঞপ্তিটিতে তারিখ হিসেবে ১৮ তারিখ উল্লেখ ছিল।
জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মুখ্য সংগঠক আবু সাঈদ লিওন, এনসিপির অঙ্গসংগঠন জাতীয় যুবশক্তির ঢাকা মহানগর পূর্ব শাখার আহ্বায়ক হামযা মাহবুবসহ এনসিপির বিভিন্ন স্তরের নেতাদের দিয়ে সরাসরি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নতুন উপদেষ্টা পর্ষদ গঠন করা হয়। এতে আরও রয়েছেন তারিকুল ইসলাম রেজা, মুইনুল ইসলাম ও শাহাদাত হোসেন।
দীর্ঘদিন ধরেই অরাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে এনসিপির এজেন্ডা বাস্তবায়নের অভিযোগ থাকলেও, এই ঘোষণার পর তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে বলে অনেকেই মনে করছেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথম আহ্বায়ক কমিটি ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই প্ল্যাটফর্মটির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় তৎকালীন উপদেষ্টা ও বর্তমান এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার হাতে। বর্তমান উপদেষ্টা পর্ষদের সদস্যদেরও তার ঘনিষ্ঠ বলেই উল্লেখ করা হচ্ছে, যা ঘিরে ‘ভাই-ব্রাদার কোরাম’ তৈরির অভিযোগ উঠেছে।
তৃণমূল পর্যায়ে এই সিদ্ধান্তকে ‘ফাজলামো’ ও ‘পকেট কমিটি’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। কুড়িগ্রাম জেলা শাখা প্রকাশ্যেই এই কমিটিকে বয়কট করেছে। সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য সচিব আতিক শাহরিয়ার বলেন, “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কারো ক্ষমতার সিঁড়ি নয়।” এতে স্পষ্ট হয়, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে দূরত্ব এখন প্রকট।
কোটি টাকার আত্মসাৎ
গত ২৩ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র সিনথিয়া জাহীন আয়েশা সংগঠনের সভাপতি রিফাত রশিদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মঈনুল ইসলাম ও মুখ্য সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রায় এক কোটি টাকার অনুদানের তথ্য গোপনের অভিযোগ তোলেন।
তার অভিযোগ অনুযায়ী, রিফাত রশিদ এককভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা সংগঠনের গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী। এছাড়া জবাবদিহির অভাব, দায়িত্ব পালনে বাধা ও আর্থিক স্বচ্ছতার ঘাটতির কথাও তুলে ধরা হয়।
অন্যদিকে, ২৫ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে রিফাত রশিদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সিনথিয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তিনি জানান, গণভোটের প্রচারণার জন্য একটি ফাউন্ডেশন গঠন করা হয়েছিল এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ৫ কোটি টাকার চুক্তি থাকলেও সময়স্বল্পতায় ৭ দিনের জন্য ১ কোটি টাকা প্রদান করা হয়। এই অর্থের হিসাব অডিট করে জমা দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
স্টেকহোল্ডারদের প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সহ-সভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল বলেন, এনসিপি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কার্যত একই সত্তায় পরিণত হয়েছে। তিনি আরও বলেন- তাদের বর্তমান আচরণে শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী চরিত্রের সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। শেখ মুজিব যেমন মুক্তিযুদ্ধকে নিজের ব্যাক্তিগত সম্পত্তি ও শেখ হাসিনা যেমন মুক্তিযুদ্ধকে পৈতৃক সম্পত্তি মনে করতেন, ঠিক তেমনই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও এনসিপি মূলত জুলাইকে নিজেদের ব্যাক্তিগত সম্পত্তি মনে করে।
অন্যদিকে, ঢাকা মহানগর পূর্ব শাখার ইসলামী ছাত্রশিবির সভাপতি আসিফ আব্দুল্লাহ বলেন, “যে আদর্শ নিয়ে আমরা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম, তা এখন আর নেই। সংগঠনটি এখন একটি রাজনৈতিক দলের প্রোপাগান্ডা বাস্তবায়নের মাধ্যম হয়ে গেছে।”
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র সিনথিয়া জাহীন আয়েশা বলেন, আন্দোলনের মূল লক্ষ্য এখনও পূরণ হয়নি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশা তৈরি হয়েছে।
জুলাই স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক নাহিদ হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন- 'ভাই অন্য কথা থাকলে বলেন, এই সংগঠনটার ব্যাপারে জিজ্ঞেস কইরেন না, এরা আমাদের রক্ত ও ত্যাগকে পুঁজি করে কেউ কেউ আজ কোটিপতি, আর জুলাইয়ের আদর্শ এখন শুধুই কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।”
অবিশ্বাস ও অনিশ্চয়তা
বিশ্লেষকদের মতে, একটি গণঅভ্যুত্থানের প্ল্যাটফর্ম যখন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রভাববলয়ে চলে যায়, তখন তার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। সভাপতি রিফাত রশিদ ও মুখ্য সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলামের কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে- এটি কি আদৌ একটি ছাত্র স্বার্থভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম, নাকি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থের মাধ্যম।
উল্লেখ্য, সদস্য সচিব হাসান ইনাম আগেই পদত্যাগ করেছেন। এরপর থেকেই সংগঠনটি এনসিপির রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নেতৃত্বের সততা ও যোগ্যতা এবং দলীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্নের সঙ্গে নিষ্ক্রিয়তার হার বৃদ্ধি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ক্ষয়িষ্ণু করে তুলেছে। যার ফলে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে জুলাইও।
পরিকল্পনা কী?
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাংগঠনিক কার্যক্রম বর্তমান স্থগিত, কিন্তু নতুন কমিটি গঠনের জন্য ৫ সদস্যের উপদেষ্টা পর্ষদকে বেঁধে দেয়া হয়েছিলো ১ মাসের সময়।
পরবর্তী পরিকল্পনা কী, এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় উপদেষ্টা হামযা মাহবুবের সাথে, তিনি বলেন- আমরা গোপনীয়তার সাথে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছি, কী হবে তা এখন বলার উপায় নাই। তবে ঈদের আগে বা পরপরই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে জানান তিনি।
ইতিহাস বলে যেকোনো বড় আন্দোলন যদি তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়, তবে তা ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারায়। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ অন্যদের মতো কোনো সাধারণ সংগঠন নয়; এটি সময়ের চেতনা ধারণ করে গড়ে ওঠা একটি সংগ্রামের প্রতীক। কিন্তু সেই চেতনা যদি সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তবে তা শহীদদের আত্মত্যাগের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে বিবেচিত হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেছন, নেতৃত্বের সততা ও যোগ্যতা এবং দলীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্নের সঙ্গে নিষ্ক্রিয়তার হার বৃদ্ধি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ক্ষয়িষ্ণু করে তুলেছে। যার ফলে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে জুলাইও।
তাই ছাত্রসমাজের বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে- এই প্ল্যাটফর্ম কি তার স্বচ্ছতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আদর্শিক অবস্থান পুনর্গঠনে সক্ষম হবে, নাকি নেতৃত্বের ভুল সিদ্ধান্তে এটি ইতিহাসের পাতায় একটি বিলীন অধ্যায়ে পরিণত হবে?
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!