কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতে ঋণ বিতরণ কমেছে
কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতে ঋণ বিতরণ কমেছে।   ছবি: আরটিএনএন

দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় শিল্পের বিকাশ ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরির অন্যতম প্রধান খাত কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই)। এ খাতে ঋণ বাড়াতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক নানামুখী উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে ঋণ বিতরণ কমছে। ফলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সিএমএসএমই খাতে ঋণ বিতরণ কমেছে প্রায় ৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের মোট ঋণ বিতরণে এ খাতের অংশ নেমে এসেছে ১৬ দশমিক ৫৮ শতাংশে। যদিও ২০২৯ সালের মধ্যে মোট ঋণের ২৭ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে অনাগ্রহী। কারণ, ছোট ঋণ ব্যবস্থাপনায় ব্যয় বেশি। পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ব্যবসায়িক তথ্য ও জামানতের ঘাটতি থাকে। অন্যদিকে বড় করপোরেট গ্রুপগুলোর ঋণ অনুমোদনে তুলনামূলক কম জটিলতা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ সুদের হার, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, নির্বাচনপূর্ব রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও এ খাতে ঋণের চাহিদা কমিয়ে দিয়েছে।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, বড় শিল্পগোষ্ঠীকেন্দ্রিক ঋণনীতি থেকে বেরিয়ে এসে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন বাড়ানো না গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। কারণ, দেশের উৎপাদন, স্থানীয় বাজার ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরির বড় ভিত্তি এখনো সিএমএসএমই খাত।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী আরটিএনএন’কে বলেন, এসএমই ও করপোরেট ঋণের ধরন এক নয়। বড় উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় জামানত ও কাগজপত্র থাকে, কিন্তু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে এসবের ঘাটতি থাকেই। তাই তাদের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই ঋণ দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ছোট উদ্যোক্তারা সাধারণত সময়মতো ঋণ পরিশোধ করেন। তারপরও ব্যাংকাররা বড় ঋণ দিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কারণ, এতে সহজে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে বড় ঋণকে এসএমই ঋণ হিসেবেও দেখানো হয়। ফলে খাতটির কাঙ্ক্ষিত বিকাশ হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতের মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ১৭ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সিএমএসএমই খাতে বিতরণ হয়েছে ৩ লাখ ১ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা।

২০২৪ সালে মোট ঋণে সিএমএসএমইর অংশ ছিল ১৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। ২০২৩ সালে ছিল ১৯ দশমিক ১১ শতাংশ। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে এ খাতে ঋণের অংশ কমছে।

শুধু ২০২৫ সালেই সিএমএসএমই খাতে ঋণ বিতরণ হয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে এ পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১৪ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। আর ২০২৩ সালে ছিল ২ লাখ ২৯ হাজার ৩১২ কোটি টাকা, যা গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

এর আগে ২০২২ সালে এ খাতে ঋণ বিতরণ হয়েছিল ২ লাখ ২০ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা। ২০২১ সালে ছিল ১ লাখ ৮৫ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। আর ২০২০ সালে বিতরণ হয়েছিল ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা।

জাতীয় এসএমই নীতির আলোকে গত বছরের মার্চে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। সেখানে বলা হয়, ২০২৯ সালের মধ্যে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণস্থিতির ২৭ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে দিতে হবে। পাশাপাশি প্রতি বছর এ খাতে ঋণের অংশ দশমিক ৫ শতাংশ করে বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নারী উদ্যোক্তা খাতে অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা ১৫ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। সেবা উপখাতে ঋণস্থিতির লক্ষ্যমাত্রা ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। অন্যদিকে ব্যবসা উপখাতে সর্বোচ্চ সীমা ৩৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে। উৎপাদনশীল উপখাতের জন্য ৪০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

সিএমএসএমই ঋণ বাড়াতে গত ডিসেম্বরে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখার শর্তও শিথিল করা হয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ ঋণ ও দুই মাস পর্যন্ত বকেয়া ঋণের বিপরীতে দশমিক ৫০ শতাংশ হারে প্রভিশন রাখতে হচ্ছে। আগে সাধারণ ঋণে ১ শতাংশ এবং এসএমএ ঋণে ৫ শতাংশ প্রভিশন রাখতে হতো।

এ ছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জামানত ছাড়াই ২৫ লাখ টাকা এবং অন্য উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের সুযোগ রাখা হয়েছে। টিআইএন না থাকলেও ব্যবসাসংক্রান্ত সনদ দেখিয়ে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে এত সুবিধার পরও ব্যাংকগুলোর আচরণে বড় পরিবর্তন আসেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বড় করপোরেট গ্রুপের তুলনায় সিএমএসএমই খাতের ঋণ তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। অন্যদিকে সিএমএসএমই খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, যা এ খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের ২৪ দশমিক ০৯ শতাংশ। এর মধ্যে ৬৮ দশমিক ৩০ শতাংশ খেলাপি ঋণ কেন্দ্রীভূত রয়েছে মাত্র ১০টি ব্যাংকে।