ব্যাংকগুলো নিরাপদ মুনাফার দিকে ঝোঁকায় পিছিয়ে পড়েছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি
ব্যাংকগুলো নিরাপদ মুনাফার দিকে ঝোঁকায় পিছিয়ে পড়েছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি।   ছবি: আরটিএনএন

লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি। টানা কয়েক মাস ধরে এ প্রবৃদ্ধি কমতে থাকায় বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে চাপ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একই সময়ে নিরাপদ মুনাফার টানে ব্যাংকগুলো ঝুঁকছে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৫৮ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে তা কমে দাঁড়ায় ৬.১০ শতাংশে এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে আরও কমে ৬.০৩ শতাংশে নেমে আসে।

ঋণের পরিমাণ বাড়লেও প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় ১৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ১৬ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা, প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬.১১ শতাংশ। অথচ চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৮.৫ শতাংশ।

এই প্রেক্ষাপটে সরকারি ঋণ দ্রুত বাড়ছে। ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ইতিমধ্যে নিট ঋণ নেওয়া হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে এ চাপ আরও বাড়তে পারে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ সুদে সরকারি সিকিউরিটিজের আকর্ষণই ব্যাংকগুলোর এই ঝোঁকের প্রধান কারণ। গত এক বছরে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার ১১ থেকে ১৩ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করছে। ঝুঁকিমুক্ত এ বিনিয়োগে ভালো রিটার্ন পাওয়ায় ব্যাংকগুলো আমানতের বড় অংশ সরকারকে ঋণ দিতে ব্যবহার করছে। এতে ব্যাংকের মুনাফা বাড়লেও সরকারের সুদ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

এর বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণের সুদহার বেড়ে অনেক ক্ষেত্রে ১৪ থেকে ১৭ শতাংশে পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে ঋণের খরচ বাড়ায় নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কমছে। অনেক উদ্যোক্তা বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেও হিমশিম খাচ্ছেন।

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, এত উচ্চ সুদে কোনো শিল্প প্রকল্প লাভজনক রাখা কঠিন। উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে যাচ্ছেন না, বরং বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছেন। ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকটও ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দিয়েছে।

খেলাপি ঋণের উচ্চ হার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। প্রায় ৩৫.৭৩ শতাংশ খেলাপি ঋণ থাকায় ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে নতুন ঋণ বিতরণে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ফলে ব্যাংকে তারল্য থাকলেও ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বর্তমানে ব্যাংকগুলো ট্রেজারি খাতে বিনিয়োগে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। তবে বিনিয়োগ পরিবেশ স্থিতিশীল হলে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়তে পারে। এজন্য ব্যাংকগুলোকে এখন থেকেই আমানত বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।