ঢাবিতে জমিদারি বিলুপ্ত দিবসে ‘মুক্তি উৎসব’
বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত এ উৎসব।   ছবি: আরটিএনএন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় ব্যতিক্রমধর্মী ‘মুক্তি উৎসবের’ মাধ্যমে ৭৬তম জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত দিবস পালন করা হয়েছে।

বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত এ উৎসবে একদিকে জমিদারি নিপীড়নবিরোধী শহীদ ও বিপ্লবী নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। অন্যদিকে জমিদারি প্রথার প্রবর্তক লর্ড কর্নওয়ালিসের প্রতিকৃতিতে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। একই সঙ্গে জমিদার নিয়োগের মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশের সম্পদ লুট ও পাচারের অভিযোগে ব্রিটেনের বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানানো হয়।

শুক্রবার সকাল থেকেই বটতলা প্রাঙ্গণে উৎসবমুখর পরিবেশের পাশাপাশি প্রতিবাদের সুর লক্ষ করা যায়। অনুষ্ঠানে হাতে রক্তের ছাপ এঁকে জমিদারি নিপীড়নবিরোধী শহীদদের স্মরণ করা হয়।

গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয় দুই শতাব্দীব্যাপী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা ও জমিদারি প্রথাবিরোধী আন্দোলনের নেতা ফকির মজনু শাহ, পণ্ডিত ভবানীচরণ পাঠক, বাবা তিলকা মাঝি, ফকির করম শাহ, টিপু শাহ, জানকুপাথর, দোবরাজপাথর, সৈয়দ মীর নিসার আলী তিতুমীর, হাজী শরীয়তুল্লাহ, মুহাম্মদ মুহসীনউদ্দীন দুদু মিয়া, খুদি মোল্লা, শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক, খাজা নাজিমুদ্দিন ও মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর প্রতি।

উৎসবে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে লর্ড কর্নওয়ালিসের প্রতিকৃতিতে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। আয়োজকদের ভাষ্য, এটি ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতি ঘৃণা ও অসম্মতির বহিঃপ্রকাশ।

অনুষ্ঠানস্থলে জমিদারি নিপীড়নবিষয়ক চিত্র ও প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। প্রদর্শনীতে প্রজাদের ওপর জমিদারদের চাপিয়ে দেওয়া ১৮ দফা নিপীড়ন এবং এ কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন অস্ত্রের তালিকা তুলে ধরা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে আসা ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের তাঁদের শিক্ষকরা চিত্র ও প্ল্যাকার্ডগুলোর ইতিহাস ব্যাখ্যা করেন। বিশেষ করে ঔপনিবেশিক শাসনামলে সাধারণ মানুষের ওপর জমিদারদের অত্যাচারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। শিক্ষকদের বর্ণনা শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি উপস্থিত দর্শকদেরও নাড়া দেয়।

মুক্তি উৎসবে বেশ কয়েকটি দাবি উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ছিল ১৯০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শোষণ, নির্যাতন, নিপীড়ন ও দুর্ভিক্ষের ইতিহাস স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান।

এ ছাড়া বাংলাদেশের জনগণের ওপর নির্যাতনে জড়িত জমিদারদের তালিকা প্রণয়ন করে স্বাধীন দেশে তাঁদের নামে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থান ও সড়কের নাম বাতিলের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে কার্জন হল থেকে লর্ড কার্জনের নাম অপসারণের আহ্বান জানানো হয়।

ঔপনিবেশিক শাসনের মাধ্যমে হত্যা-নির্যাতন চালিয়ে সম্পদ লুট এবং জমিদারির নামে জনগণের ওপর নিপীড়ন চালানোর অভিযোগে ব্রিটেনকে বিচারের মুখোমুখি করে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান বক্তারা।

উৎসবে বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের আহ্বায়ক আবদুল ওয়াহেদ ও সহকারী সদস্যসচিব মো. আরিফুল ইসলামের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম, নবাব সলিমুল্লাহ একাডেমির চেয়ারম্যান আবদুল জব্বার এবং জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের আহ্বায়ক খোমেনী ইহসান।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইয়েদ কুতুব, সহকারী সদস্যসচিব গালীব ইহসান, সদস্য মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম ও সাইফুল ইসলাম।

ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম বলেন, জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করতে এ দেশে বহু আন্দোলন হয়েছে। তিতুমীর, হাজী শরীয়তুল্লাহসহ অনেকে এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সর্বশেষ শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়। তাঁদের সাফল্য থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশে চালু হওয়া নব্য জমিদারি প্রথাও বিলুপ্ত করতে হবে।

তিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক ও তাঁদের সহযোগী জমিদারদের ইতিহাস চর্চার আহ্বান জানান।

আব্দুল জব্বার বলেন, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণিত ছিলেন জমিদারি প্রথার প্রবর্তক লর্ড কর্নওয়ালিস। তিনি সূর্যাস্ত আইন করে মুসলিম জমিদারদের নিঃস্ব করে তাঁদের হিন্দু নায়েব-গোমস্তাদের হাতে জমিদারি তুলে দিয়েছিলেন।

খোমেনী ইহসান বলেন, জমিদারি প্রথা ছিল শোষণ, নিপীড়ন ও বৈষম্যের প্রতীক। আমাদের পূর্বপুরুষেরা ১৯৩ বছর সংগ্রাম করে এ প্রথা উচ্ছেদ করেছেন। একইভাবে চাকরিতে কোটা প্রথাও ছিল বৈষম্যমূলক। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে কোটা প্রথা বাতিল হয়েছে। কিন্তু জনগণ এখনো পুরোপুরি বৈষম্যমুক্ত হয়নি। প্রকৃত মুক্তি পেতে হলে বৈষম্যমূলক বর্তমান সংবিধান, ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্র ও লুটপাটের অর্থনীতি বদলাতে হবে।

জমিদারদের নিপীড়নে নিহত ব্যক্তিদের রুহের মাগফিরাত কামনা এবং জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ায় মহান আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায়ে বিশেষ দোয়া মাহফিলের মধ্য দিয়ে উৎসব শেষ হয়।