দুর্গম চরাঞ্চলে শিক্ষাব্যবস্থা এখন সংকটে 
দুর্গম চরাঞ্চলে শিক্ষাব্যবস্থা এখন সংকটে।   ছবি: আরটিএনএন

কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলগুলোতে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। শিক্ষকদের অনিয়মিত উপস্থিতি, প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে পাঠদান, অবকাঠামোগত সংকট ও তদারকির অভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ। ফলে ন্যূনতম শিক্ষা সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে চরাঞ্চলের হাজারো শিক্ষার্থী।

সম্প্রতি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার মোগলবাসা ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর উত্তর মাঝের চর আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে এমনই একটি চিত্র দেখা গেছে। মরিচা ধরা টিনের ঘরে মাটিতে মাদুর পেতে চলছিল চতুর্থ শ্রেণির পাঠদান। দেখে এটি কোনো মক্তবঘর বা গ্রামের টিউশনি সেন্টার মনে হলেও বাস্তবে এটি একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

বিদ্যালয়টিতে গিয়ে দেখা যায়, বাইরে জাতীয় পতাকা উড়ছে, টিনে রঙ করা ভবন দূর থেকে স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। পুরো বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিল মাত্র ১২ জন শিক্ষার্থী। শ্রেণিকক্ষে নেই কোনো ফ্যান। তীব্র গরমের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা কষ্ট করে পাঠ গ্রহণ করছে। একটি কক্ষে কিছু পুরোনো বেঞ্চ থাকলেও সেগুলো প্রায় ব্যবহার অনুপযোগী। পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় শিক্ষার্থীদেরই ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার রাখতে হচ্ছে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলতাফ হোসেন নিয়মিত স্কুলে আসেন না। তারা জানান, সপ্তাহে একদিন এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে চলে যান তিনি। অনেক সময় শিক্ষক সংকটে ক্লাস বন্ধ থাকে কিংবা অন্যের মাধ্যমে পাঠদান চালানো হয়। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে।

চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলে, “স্যাররা অনেক সময় স্কুলে আসে না। মাঝে মাঝে ক্লাস বন্ধ থাকে। আমরা মাটিতে বসে পড়ি। গরমে খুব কষ্ট হয়। তারপরও পড়ালেখা করতে চাই।”

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সাংবাদিক উপস্থিতির খবর পেয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছান প্রধান শিক্ষক আলতাফ হোসেন। এ সময় বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকেন না বলেই অভিযোগ রয়েছে।

অভিভাবক আব্দুল জলিল বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে ভালো মানুষ করতে চাই। কিন্তু স্কুলে শিক্ষক ঠিকমতো না এলে বাচ্চারা কী শিখবে? চর এলাকার স্কুলগুলোর দিকে সরকারকে নজর দিতে হবে।”

অভিভাবক রহিমা বেগম বলেন, “প্রধান শিক্ষককে বেশিরভাগ সময় স্কুলে পাওয়া যায় না। বাচ্চারা স্কুলে গিয়ে ফিরে আসে। এতে পড়াশোনার প্রতি তাদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।”

স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবক নুর ইসলাম বলেন, “শিক্ষকরা নিয়মিত না আসায় শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ হলেও দায়িত্ব তো পালন করতে হবে। শুধু হাজিরা দিলেই দায়িত্ব শেষ না।”

অভিভাবক হালিমা খাতুন বলেন, “স্কুলে ফ্যান নেই, বেঞ্চ ভাঙা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতারও ব্যবস্থা নেই। ছোট ছোট বাচ্চারা নিজেরাই ঝাড়ু দেয়। এটা খুবই দুঃখজনক।”

বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চরাঞ্চলের অনেক বিদ্যালয়েই একই অবস্থা বিরাজ করছে। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে কিছু শিক্ষক নিয়মিত বিদ্যালয়ে না এসেও প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে পাঠদান করান।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রধান শিক্ষক আলতাফ হোসেন। তিনি বলেন, “এই বিদ্যালয়ের জন্য আমি জীবনের সব শ্রম ও সময় উজাড় করে দিয়েছি। আমার নামে যারা এসব অভিযোগ তুলছে, তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ষড়যন্ত্র করছে। আমি নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসি এবং দায়িত্ব পালন করি।”

স্থানীয়দের দাবি, জেলার চার শতাধিক চরাঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধিকাংশেই একই ধরনের অনিয়ম চলছে। শিক্ষকদের অনুপস্থিতি, প্রক্সি ক্লাস এবং মাস শেষে পুরো বেতন উত্তোলনের মতো অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে থাকলেও কার্যকর নজরদারির অভাবে কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা স্বপন কুমার সরকার বলেন, “বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা হবে।”

শিক্ষাবিদদের মতে, চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এমনিতেই নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের মধ্যে বেড়ে ওঠে। সেখানে বিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে পুরো একটি জনগোষ্ঠী শিক্ষার মূলধারা থেকে পিছিয়ে পড়বে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু জাতীয় পতাকা উত্তোলন কিংবা হাজিরা খাতা পূরণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর ও নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করাই শিক্ষকদের মূল দায়িত্ব। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে চরাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা আরও ভয়াবহ সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।