সাদিক কায়েম ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
সাদিক কায়েম ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া।   ফাইল ছবি

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনে মেয়র পদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েমের সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। বিষয়টি ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা গেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া—কেউ এটিকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন তুলে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন।

শুক্রবার (১ মে) দুপুরে ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের সহকারী প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি আশরাফুল আলম ইমন আরটিএনএনকে জানান, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে মেয়র প্রার্থী হিসেবে খুব শিগগিরই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করবে জামায়াত। ঘোষণা পর্যন্ত সবাইকে ধৈর্য্য ধরতে হবে।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের এক কর্মপরিষদ সদস্য এদিন আরটিএনএনকে জানান, শুক্রবার সকালে এক দায়িত্বশীল বৈঠকে ঘরোয়ভাবে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমকে দক্ষিণ সিটির মেয়র প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এমনকি এই অনুষ্ঠানে সাদিক কায়েম নিজেও উপস্থিত ছিলেন।

তবে, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কোনো দায়িত্বশীলকে জামায়াতের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণার বিষয়ে প্রচারিত সংবাদকে বিভ্রান্তিকর বলে জানিয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির।

গত শুক্রবার এক জরুরি ঘোষণায় কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, কিছু অনলাইন পোর্টালে এ ধরনের সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে, যা সঠিক নয়। চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো দোলাচালে, তবুও সাদিক ইস্যুতে ঢাবি ক্যাম্পাসে আলোচনা এখন তুঙ্গে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও বিভাগ ঘুরে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ মনে করেন—ডাকসুর ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় সিটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে সাদিক কায়েমের উচিত তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়নে মনোযোগ দেওয়া। বিজয় একাত্তর হলের শিক্ষার্থী মো. জিহাদ বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনের সময় শিক্ষার্থীদের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার অনেক কিছুই এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। আগে সেগুলো পূরণ করা দরকার, তারপর অন্য নির্বাচনের চিন্তা করা উচিত।’

একই সুর শোনা যায় মাস্টারদা সূর্য সেন হলের শিক্ষার্থী রাজীব হাসানের বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘একজন ভিপি হিসেবে তার প্রথম দায়িত্ব ক্যাম্পাসের সমস্যাগুলো সমাধান করা। যদি তিনি সত্যিই শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হন, তাহলে মেয়র নির্বাচন নয়, ডাকসুকে কার্যকর করাই তার অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। তবে বড় পরিসরে রাজনীতি করা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু সময়টা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে কেবল সমালোচনা নয়, কিছু শিক্ষার্থী বিষয়টিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে অংশগ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবেও দেখছেন। তাদের মতে, ছাত্রনেতাদের জাতীয় বা নগর রাজনীতিতে প্রবেশ নতুন কিছু নয়। একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘ছাত্র রাজনীতি থেকেই তো জাতীয় নেতৃত্ব তৈরি হয়। সাদিক কায়েম যদি বৃহত্তর পরিসরে কাজ করতে চান, সেটি ইতিবাচক দিকও হতে পারে—যদি তিনি তার বর্তমান দায়িত্বের যথাযথ সমাপ্তি নিশ্চিত করেন।’

অন্যদিকে, এই সম্ভাব্য প্রার্থিতাকে ঘিরে তীব্র বিরোধিতাও লক্ষ করা গেছে। অনেক শিক্ষার্থী মনে করছেন, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় অন্য নির্বাচনে অংশ নেওয়ার চিন্তা নৈতিকতার প্রশ্ন তোলে এবং এটি শিক্ষার্থীদের প্রতি একধরনের অবিচার। শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হৃদয় হোসেন বলেন, ‘ডাকসুর ভিপি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে এখনো পূর্ণ মেয়াদ শেষ হয়নি। এই অবস্থায় অন্য নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যে দায়িত্ব নিয়ে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন, সেটির প্রতি পূর্ণ মনোযোগ না দিয়ে অন্য রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে এগোনো ঠিক নয়। এতে ডাকসুর কার্যক্রম আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।’

সব মিলিয়ে, জামায়াতে ইসলামী এবং সাদিক কায়েমের ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীতা এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকলেও এটি ইতোমধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আলোচনার ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। দায়িত্ব, নৈতিকতা, এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ—এই তিনটি প্রশ্নের সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি বিভক্ত হয়ে পড়েছে।