মেরিন ড্রাইভে বেপরোয়া অবৈধ রেন্টবাইক, বাড়ছে প্রাণহানি
মেরিন ড্রাইভে বেপরোয়া অবৈধ রেন্টবাইক, বাড়ছে প্রাণহানি   ছবি: আরটিএনএন

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কে অনিয়ন্ত্রিতভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অবৈধভাবে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল বা ‘রেন্ট বাইক’। দ্রুতগতি, হেলমেটবিহীন চলাচল এবং অদক্ষ চালকদের কারণে এই সড়কে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। এতে হতাহত হচ্ছেন বহু পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, হিমছড়ি ও ইনানী পুলিশ ফাঁড়িকে ‘ম্যানেজ’ করে মাসিক মাসোহারার ভিত্তিতে চলছে এই অবৈধ রেন্ট বাইক বাণিজ্য। নির্ধারিত মাসোহারা প্রদানকারী মোটরসাইকেলগুলোতে একটি বিশেষ ‘লোগো’ বা ‘চিহ্ন’ ব্যবহার করা হয়। ওই চিহ্ন থাকলে বাইকের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা জব্দ অভিযান পরিচালনা করা হয় না। অন্যদিকে, চিহ্নবিহীন মোটরসাইকেল পেলেই তা আটকে মামলা দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রতিটি বাইক থেকে প্রতি মাসে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা মাসোহারা হিসেবে আদায় করা হয়। এই টাকার বিনিময়ে অবৈধ মোটরসাইকেলগুলোও কার্যত নির্বিঘ্নে চলাচলের সুযোগ পাচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, হিমছড়ি ও ইনানী ফাঁড়িকে কেন্দ্র করে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে।

কক্সবাজারে প্রতিদিন সমাগম ঘটে হাজার হাজার পর্যটকের। তাদের ঘিরে গড়ে ওঠা ব্যবসার অন্যতম একটি এখন ‘রেন্ট বাইক সার্ভিস’। কলাতলী ডলফিন মোড়, সুগন্ধা পয়েন্ট ও মেরিন ড্রাইভ সড়কের বিভিন্ন স্থানে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও হেলমেট ছাড়াই মোটরসাইকেল ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। ঘণ্টাপ্রতি এসব বাইকের ভাড়া নেওয়া হয় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা।

পর্যটকদের অনেকেই শখের বশে কিংবা মোটরসাইকেল চালানো শেখার জন্য এসব বাইক ভাড়া নিচ্ছেন। কিন্তু অপরিচিত সড়কে হেলমেটবিহীন অবস্থায় চলাচল করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন অনেকে। তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, গত দুই বছরে এই রেন্ট বাইক সার্ভিস সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় অন্তত ২০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ। বিশেষ করে স্থানীয় তরুণ-তরুণী ও পর্যটকরা নিরিবিলি সড়ক হিসেবে মেরিন ড্রাইভকে বেছে নেওয়ায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

এ ছাড়া দুর্ঘটনার পর পর্যটকদের জিম্মি করে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। সামান্য ক্ষতি হলেও আদায় করা হচ্ছে কয়েক গুণ বেশি জরিমানা।

কুমিল্লা থেকে আসা পর্যটক মুনির হাসান নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “মোটরসাইকেল ভাড়া নিয়ে মেরিন ড্রাইভ ঘুরতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হই। বাইকের সামান্য ক্ষতি হওয়ায় আমাকে দ্বিগুণ টাকা জরিমানা দিতে হয়েছে। বিভিন্ন অজুহাতে পর্যটকদের জিম্মি করে টাকা আদায় করা হয় এখানে।”

স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল রহমান বলেন, ইনানী ও হিমছড়ি ফাঁড়িকে ম্যানেজ করে মাসিক মাসোহারায় চলছে শত শত অবৈধ রেন্ট বাইক। এই ব্যবসার কারণে শতশত তরুণ-তরুণী অকালে প্রাণ হারাচ্ছে। এটি দ্রুত বন্ধ করা উচিত।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, রেন্ট বাইক সার্ভিসের কারণে প্রতিনিয়ত প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। তারা দ্রুত এসব অবৈধ যানবাহন বন্ধে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) সোমনাথ বলেন, এসব অবৈধ কাজের সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত নই। বিশেষ প্রয়োজনে মেরিন ড্রাইভে অভিযান পরিচালনা করা হয়। টাকার কোনো লেনদেন সম্পর্কে আমার জানা নেই।

যোগাযোগ করা হলে ইনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক দূর্জয় সরকার বলেন, মেরিন ড্রাইভ রোডে আমার কোনো দায়িত্ব নেই। সেখানে আমার কোনো চেকপোস্টও নেই। আমার দায়িত্ব এলজিইডি সড়কে। মোটরসাইকেল সংক্রান্ত বিষয়ের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা নেই।

যানবাহনের নিবন্ধন ও সড়ক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ)। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএ কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. কামরুজ্জামান রেন্ট বাইক নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি কেবল জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন।

সার্বিক বিষয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) দেবদূত মজুমদার বলেন, বিশেষ লোগোসংবলিত বাইক এবং সামগ্রিক বিষয়টি নিয়ে আমরা দ্রুত অভিযান পরিচালনা করব। বিষয়টি ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও জানানো হয়েছে।