ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার উমেদপুর ইউনিয়নের লক্ষণদিয়া গ্রাম। প্রকৃতির সবুজে ঘেরা এক শান্ত জনপদ। চারদিকে গাছপালা থাকলেও এই গ্রামের একজন মানুষ দেখেছিলেন ভিন্ন এক স্বপ্ন। তিনি চেয়েছিলেন, শুধু সবুজ নয়-সবুজের বুক চিরে ফুটে উঠুক কৃষ্ণচূড়ার উজ্জ্বল লাল, যেন পুরো গ্রাম একদিন রূপ নেয় এক অনন্য নান্দনিকতায়।
স্বপ্নবাজ সেই মানুষটির নাম আমিনুল ইসলাম। ছোটবেলা থেকেই গাছের প্রতি গভীর ভালোবাসা ছিল তার। সেই ভালোবাসা থেকেই শুরু হয় এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। নিজের ব্যক্তিগত অর্থ,সময় ও শ্রম দিয়ে বছরের পর বছর ধরে গ্রামের বিভিন্ন রাস্তার ধারে,খোলা জায়গায়,শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশে লাগাতে থাকেন কৃষ্ণচূড়ার চারা। লক্ষ্য একটাই-লক্ষণদিয়াকে ‘কৃষ্ণচূড়া গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত করা।
তিনি বিশ্বাস করতেন, কয়েক বছর পর গাছগুলো বড় হয়ে যখন ফুলে ভরে উঠবে, তখন লাল রঙে ঢেকে যাবে গ্রামের পথঘাট। সেই সৌন্দর্য দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসবে মানুষ। সেই স্বপ্ন নিয়ে গ্রামের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১ হাজার কৃষ্ণচূড়া গাছ লাগান তিনি। যত্নে করতে থাকেন। কিন্তু কিছুদিন যেতেই শুরু হয় দুর্বৃত্তদের নির্যাতন। গাছের গোড়ায় দেওয়া হয় বিষাক্ত কেমিকেল। ফলে ধীরে ধীরে মরতে থাকে গাছগুলো। ফলে প্রায় হাজারো গাছের মধ্যে টিকে আছে মাত্র ৫০টির মত গাছ। যা এলাকায় সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে।
স্থানীয়রা বলছেন, গ্রীষ্ম এলেই সেই গাছগুলোতে ফুটে ওঠে আগুনরাঙা কৃষ্ণচূড়া ফুল। লাল ফুলে সেজে ওঠা গ্রামের পথ মুগ্ধ করে পথচারী ও দর্শনার্থীদের। প্রতিদিনই আশপাশের এলাকা ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে। অনেকেই ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন গ্রামের এই অনন্য দৃশ্য।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান,গাছ লাগানোর সময় অনেকেই সহযোগিতা করলেও পরে সেই আগ্রহ আর দেখা যায়নি। কেউ কেউ গাছের ডাল ভেঙেছে, কেউ অবহেলায় নষ্ট করেছে,আবার কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতি করেছে। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে সেই উদ্যোগের বড় একটি অংশ।
ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রকৃতিপ্রেমী আমিনুল ইসলাম বলেন,‘অনেক কষ্ট করে,নিজের টাকায় গাছগুলো লাগিয়েছিলাম। যত্ন করেছি। কিন্তু কিছু মানুষ গাছের গোড়ায় বিষ দিয়ে একে একে মেরে ফেলেছে। এটা শুধু গাছ ধ্বংস নয়, একটা স্বপ্ন ধ্বংস। যদি গাছগুলো বেঁচে থাকত,তাহলে আমাদের গ্রামটা আজ অনেক সুন্দর হতো। দেশের মানুষ এই গ্রামকে চিনত ‘কৃষ্ণচূড়া গ্রাম’ হিসেবে।’
পরিবেশ সচেতন ব্যক্তি সুজন বিপ্লব বলেন, ‘একজন মানুষের একক উদ্যোগে এমন একটি পরিবেশবান্ধব ও নান্দনিক প্রকল্প গড়ে উঠেছিল,যা সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এটি হতে পারত একটি মডেল গ্রাম। এটি শুধু পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখত না,বরং গ্রামীণ পর্যটনেরও একটি সম্ভাবনা তৈরি করত।
তিনি মনে করেন, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহল যদি শুরু থেকেই এই উদ্যোগকে গুরুত্ব দিত,তাহলে হয়তো এতগুলো গাছ নষ্ট হতো না। এখনো বাকি যে গাছগুলো রয়েছে,সেগুলো রক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ ও নজরদারি।’
এদিকে কৃষ্ণচূড়া গাছ রক্ষার আশ্বাস দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, আমিনুল ইসলাম এবিষয়ে লিখিত অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লক্ষণদিয়ার পথে দাঁড়িয়ে থাকা অল্প কয়েকটি কৃষ্ণচূড়া গাছ আজও লাল হয়ে ফুটে ওঠে-কিন্তু সেই লালের মাঝে মিশে আছে হারিয়ে যাওয়া হাজারো স্বপ্নের কষ্ট। তবুও আশাবাদী আমিনুল ইসলাম। তিনি চান, নতুন করে আবার গাছ লাগাতে, আবারও স্বপ্ন দেখতে। কারণ, তার বিশ্বাস-একদিন হয়তো আবারও লাল হয়ে ফুটবে পুরো গ্রাম,আর লক্ষণদিয়া ফিরে পাবে তার পরিচয় ‘কৃষ্ণচূড়ার গ্রাম’।
প্রসঙ্গত, শুধু কৃষ্ণচূড়া নয়, আমিনুল ইসলামের ভালোবাসা ছড়িয়ে আছে সব ধরনের গাছের প্রতিই। নিজের বাড়িতে মা আখতার বানুর নামে একটি সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন তিনি। সেই কেন্দ্রের চারপাশ সাজিয়েছেন বিভিন্ন ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছে। গাছপালায় ঘেরা এই বাড়িটিই এখন এলাকায় পরিচিত ‘গাছ বাড়ি’ নামে।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!