জাপানে দীর্ঘদিন বসবাস করলেও বাংলাদেশের মানুষ, প্রকৃতি ও লোকজ সংস্কৃতি চিত্রশিল্পী কামরুল হাসান লিপুর শিল্পকর্মে বারবার ফিরে আসে। নারীর মুখাবয়ব, শাপলা, শাড়ির নকশা এবং লাল-সবুজের বর্ণবিন্যাসে তিনি তুলে ধরেন জন্মভূমির স্মৃতি ও নিজস্ব পরিচয়ের নানা দিক। শিল্পীর এই সৃজনযাত্রা নিয়ে জাপানের ইয়োকোহামার গ্যালারি শিমিজুতে শুরু হয়েছে তাঁর প্রথম একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘ডট: সবকিছুর শুরু—বিন্দু থেকে সৃষ্টি’।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেল ৩টায় প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাপানের মাৎসুদো সিটি কাউন্সিলর মির কাজুএ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জাপানি চিত্রশিল্পী ও ইয়োকোহামা পোর্ট ইন্ডিপেনডেন্ট প্রদর্শনীর উপদেষ্টা আসানো ইয়াসুনোরি, কাগজ কেটে শিল্পকর্ম তৈরির শিল্পী মিতা চিকাকো এবং গ্যালারি শিমিজুর প্রতিনিধি শিমিজু কাজুএ। আগামী ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এ প্রদর্শনীতে মোট ৪১টি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে।
বিন্দু থেকে বিস্তৃত শিল্পের জগৎ
প্রদর্শনীর নামের মধ্যেই রয়েছে শিল্পীর সৃষ্টিচিন্তার মূল ধারণা। একটি বিন্দু থেকে রেখা, রেখা থেকে অবয়ব এবং অবয়বের মাধ্যমে বৃহত্তর দৃশ্যজগতের জন্ম—এই ধারাকে নিজের শিল্পজীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন কামরুল হাসান লিপু।
শৈশবের ছবি আঁকার অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে দীর্ঘদিনের শিল্পচর্চা এবং বাংলাদেশ ও জাপানে বসবাসের নানা অভিজ্ঞতা তাঁর এবারের প্রদর্শনীতে একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। ব্যক্তিগত স্মৃতি, সাংস্কৃতিক শিকড় ও শিল্পের নিজস্ব ভাষা এখানে পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে।
নারীর মুখে সৌন্দর্য ও আত্মপরিচয়ের গল্প
লিপুর চিত্রকর্মে নারীর মুখ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শাড়ির ভাঁজ, গয়না, খোঁপায় ফুল এবং চোখেমুখের অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে তিনি বাংলার পরিচিত জীবন ও সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ তুলে ধরেছেন। তাঁর ছবিতে সৌন্দর্যের পাশাপাশি নারীর আত্মমর্যাদা, সংবেদনশীলতা ও মানসিক শক্তির প্রকাশও লক্ষ করা যায়।
কখনো সরাসরি দর্শকের দিকে তাকিয়ে থাকা চোখ, কখনো নীরব ও ধ্যানমগ্ন মুখাবয়ব—এসব উপস্থাপনায় মানুষের ভেতরের অনুভূতি ও মনোজগতের প্রতি মনোযোগী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
‘বেদের মেয়ে’, ‘মাধবী’, ‘মৃণালিনী’ ও ‘নীলের ওপারে’ শিরোনামের ছবিতে নারীর অবয়বকে ঘিরে শিল্পীর ভিন্ন ভিন্ন অনুসন্ধান ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে ‘গল্পে বোনা শাড়ি’ চিত্রকর্মে নারী, ময়ূর, পাখি ও ফুলের সমন্বয়ে শাড়িকে স্মৃতি ও গল্পের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। লোকজ নকশা এবং বাংলাদেশের রিকশাচিত্রের উজ্জ্বল রঙের প্রভাবও তাঁর চিত্রভাষায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
শাপলার স্মৃতি থেকে শিল্পযাত্রার গল্প
শাপলা ফুলের সঙ্গে লিপুর ব্যক্তিগত স্মৃতির সম্পর্ক রয়েছে। মাত্র আট বছর বয়সে একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সময় তিনটি রঙিন পেনসিল দিয়ে শাপলা আঁকা শুরু করেছিলেন তিনি। পরে অন্যদের কাছ থেকে পেনসিল ধার করে ছবিতে আরও রং যোগ করেন। সেই ছবির জন্য পেয়েছিলেন তৃতীয় পুরস্কার।
প্রদর্শনীর পরিচিতিপত্রে শিল্পীর নিজের বক্তব্যে উঠে এসেছে শৈশবের সেই ঘটনা। তাঁর শিল্পজীবনের শুরুর দিকের এই স্মৃতি ‘বিন্দু থেকে সৃষ্টি’ ধারণাটিকে বিশেষ অর্থ দিয়েছে। শাপলা তাই তাঁর কাছে শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, বরং শিল্পী হয়ে ওঠার পথচলারও একটি স্মারক।
‘শাপলার উচ্ছ্বাস’ ও ‘ফোটার অপেক্ষায়’ শিরোনামের কাজে শাপলা, ফুল ও কুঁড়ির বিন্যাসের মাধ্যমে জীবনের সম্ভাবনা, বিকাশ এবং নতুন করে জেগে ওঠার অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে।
এ ছাড়া ‘ঘুড়ির সুতার ওপারে শৈশব’ ছবিতে পুরান ঢাকার ছাদে ঘুড়ি ওড়ানোর শৈশবস্মৃতি উঠে এসেছে। ‘স্বাধীনতার পতাকা’ চিত্রকর্মে লাল-সবুজের ব্যবহার বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক আবেগের সঙ্গে ব্যক্তিগত অনুভবকে যুক্ত করেছে।
রং, রেখা ও নিরীক্ষায় স্বতন্ত্র প্রকাশভঙ্গি
প্রদর্শনীতে অ্যাক্রিলিক রং, তেলরং ও মিশ্র মাধ্যমে তৈরি বিভিন্ন ধরনের কাজ রয়েছে। কোনো ছবিতে পরিচিত অবয়ব ও দৃশ্য স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে, আবার কোনো কাজে শিল্পী বিমূর্ততার দিকে এগিয়েছেন।
রঙের স্তরবিন্যাস, স্বতঃস্ফূর্ত রেখা, তুলির আঁচড় এবং বিভিন্ন ধরনের উপরিতলের গঠন ব্যবহারে তাঁর ছবিতে তৈরি হয়েছে বৈচিত্র্য। বিষয়বস্তুর পাশাপাশি মাধ্যম ও প্রকাশভঙ্গি নিয়েও শিল্পীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রদর্শনীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
২০১২ সালে টোকিওর তোয়ো ইনস্টিটিউট অব আর্ট অ্যান্ড ডিজাইন থেকে চিত্রকলায় উচ্চতর ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন কামরুল হাসান লিপু। জাপানে শিল্পশিক্ষা গ্রহণ ও দীর্ঘদিন বসবাসের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের মানুষ, প্রকৃতি এবং লোকজ ঐতিহ্যকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ তৈরি করেছে। তাঁর কাজেও সেই অভিজ্ঞতার ছাপ রয়েছে।
এর আগে বিভিন্ন যৌথ শিল্পপ্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন তিনি। ২০২৬ সালের চতুর্দশ ইয়োকোহামা পোর্ট ইন্ডিপেনডেন্ট প্রদর্শনী এবং একই বছরের ২৯তম সেয়া শিল্পকলা প্রদর্শনীতে তাঁর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। সেয়া শিল্পকলা প্রদর্শনীতে তিনি আমন্ত্রিত শিল্পী হিসেবে অংশ নেন।
শিল্পের পাশাপাশি দুই দেশের সংস্কৃতির সেতুবন্ধন
চিত্রকর্ম সৃষ্টির পাশাপাশি জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত রয়েছেন লিপু। তাঁর প্রতিষ্ঠিত কাহাল শিল্পগোষ্ঠী বাংলাদেশ ও জাপানের শিল্পীদের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
কাহাল চিত্রশালার উদ্যোগে বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের কাজ প্রদর্শন, বাংলাদেশের নকশিকাঁথা ও লোকশিল্প পরিচিত করা এবং জাতীয় দিবস উপলক্ষে সাংস্কৃতিক আয়োজনের মতো কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এর মাধ্যমে প্রবাসে বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন তিনি।
প্রদর্শনীর পরিচিতিপত্রে শুভেচ্ছা ও মূল্যায়নমূলক বক্তব্য দিয়েছেন শিল্পী রফিকুন নবী, জামাল আহমেদ, অধ্যাপক শাহজাহান আহমেদ বিকাশ এবং জাপানি গ্রাফিক নকশাবিদ ও শিল্পসমালোচক ইকুফুমি ফুকুজাওয়া। তাঁদের বক্তব্যে লিপুর নিয়মিত শিল্পচর্চা, রং ও উপরিতলের গঠন, সাংস্কৃতিক স্মৃতি এবং সৃজনশীল নিরীক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
২৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে প্রদর্শনী
গ্যালারি শিমিজুতে আয়োজিত এই একক প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীরা কামরুল হাসান লিপুর শিল্পচর্চার বিভিন্ন পর্যায় ও বিষয়বস্তুর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। নারীর মুখ, শাপলা, লোকজ অলংকরণ, শৈশবের স্মৃতি এবং বিমূর্ত রঙের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে শিল্পী তুলে ধরেছেন মানুষ, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান।
প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত প্রদর্শনীটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। শেষ দিন রোববার, ২৫ অক্টোবর, বিকেল ৪টা পর্যন্ত এটি দেখা যাবে।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!