‘ভারতের ইশারায় দেশকে অস্থিতিশীল না করে পুনর্গঠণে সরকারকে সহায়তা করুন’ 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে খোমেনী ইহসান।   ছবি: আরটিএনএন

গণভোট ও সংবিধান সংস্কার ইস্যুর নামে ভারতের ইশারায় জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছে জাতীয় বিপ্লবী পরিষদ।

বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে খোমেনী ইহসান এ কথা বলেন।

দলটির আহ্বায়ক খোমেনী ইহসানের দাবি, বিএনপি সরকার ভারতের কথামতো না চলায় ২০০৭ সালের এক-এগারোর মতো অভ্যুত্থান ঘটানোর পরিকল্পনা চলছে।

তিনি মনে করেন, পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিরোধী জোটকে দিয়ে দুই মাস বয়সী সরকার পতনের কথা বলা হচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়ার নামে সরকারি দলের একটি অংশও বিরোধী দলের ছাত্র ও তৃণমূল সমর্থকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এতে পরিস্থিতির অবনতি হলে পরাজিত রাজনৈতিক শক্তির পুনরুত্থান ঘটানো হবে এবং তারা বিরোধী দলের সঙ্গে মিলে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ভারতের পছন্দের লোকদের দিয়ে সরকার গঠন করবে।

তিনি ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির পর একাধিক ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তৎকালীন প্ল্যাটফর্ম ‘নির্যাতন প্রতিরোধ ছাত্র আন্দোলন’-এর তিনি আহ্বায়ক ছিলেন।

সে সময় কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতে পালিয়ে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করে তিনি আলোচিত হন। ২০১৮ সালে তিনি স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে যান।

চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর জাপানে অবস্থান করেই তিনি জাতীয় বিপ্লবী পরিষদ নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে তিনি দেশে ফিরে এসে দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

সংবাদ সম্মেলনে খোমেনী ইহসান বলেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত এবং ২০০৭ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতার সঙ্গে এর যোগসূত্র রয়েছে।

সে সময় ক্ষমতা দখলকারী সামরিক নেতৃত্ব ভারতের সঙ্গে গোপন আঁতাত করে ২০০৮ সালের নির্বাচন জালিয়াতির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও বামপন্থীদের ক্ষমতায় বসায়। তারা ভারতের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সঁপে দিয়ে নিজেদের জমিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ১৬ বছর বিরোধী মতপথের মানুষের ওপর পিলখানা-শাপলা চত্বর গণহত্যা, গুম-খুনসহ হামলা-মামলা, জেল-জুলুমের স্টিমরোলার চালায়। রাষ্ট্রীয় সম্পদ, বিদেশি ঋণ এবং ব্যাংক-বিমা থেকে জনগণের সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার করা হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তার দাবি, চব্বিশের জুলাইয়ে ব্যাপক গণহত্যা করায় গণরোষের মুখে শেখ হাসিনা ও চিহ্নিত আওয়ামী দুর্বৃত্তরা বিদেশে পালিয়ে গেছে। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের পর নতুন সংবিধান প্রণয়ন, ফ্যাসিবাদী রাজনীতি নিষিদ্ধ ও ভারতের সঙ্গে অসম সম্পর্কের অবসান না ঘটায় দেশ জমিদারতন্ত্রমুক্ত হয়নি।

তিনি বলেন, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানো নেপথ্য শক্তি জুলাই বিপ্লবের পর ভারতের বি-টিম, সি-টিমকে ক্ষমতায় বসাতে চেয়েছিল। তা না পেরে তারা জুলাইকে ব্যর্থ করে দিতে সব চেষ্টা করেছে। তাদের ইন্ধনেই পরিপূর্ণ জাতীয় ঐকমত্য ছাড়া জুলাই সনদ প্রণয়ন ও গণভোট করে জাতীয় নির্বাচনের পর দেশকে অনৈক্যের পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। একদিকে নেপথ্য শক্তি সরকারকে বলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার না করতে, অন্যদিকে বিরোধী দলকে বলে আন্দোলন করতে।

খোমেনী ইহসান অভিযোগ করেন, ভারত চায় বিএনপি সরকারকে দিয়ে পতিত আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে। ভারত চায় পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ের মতো আবারও বাংলাদেশে আধিপত্য করতে। কিন্তু সরকার সংসদে সন্ত্রাসবাদী আইন পাস করে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে। সরকার ভারতের একক আজ্ঞাবহ না হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলছে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ভারত ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নেপথ্যের শক্তি জুলাই সনদ ও গণভোট প্রশ্নে ক্ষুব্ধ বিরোধী জোটকে দিয়ে বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্র করছে। তারা দুই মাস বয়সী সরকারের বিরুদ্ধে জনগণকে খেপিয়ে তুলে ২০০৭ সালের এক-এগারোর মতো অভ্যুত্থান ঘটানোর টার্গেট করেছে।

জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের আহ্বায়ক ভারতের ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় সরকার, সব রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, আলেম-ওলামা ও তরুণ সমাজকে সংলাপের মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করে দেশ-জাতি পুনর্গঠনে একটি নতুন ‘সামাজিক চুক্তি’ প্রণয়নের আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে চলমান সংকট মোকাবিলা করে চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছাতে জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের পক্ষ থেকে চার দফা আশু সমাধান প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে, ওয়ান-ইলেভেন-পরবর্তী সব সাংবিধানিক বিকৃতি ও দলীয়করণ বাতিল করে সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ বাদ দিয়ে মহান আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ প্রতিস্থাপন; রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব ও মারমুখী অবস্থান বন্ধ করে জুলাই সনদের যেসব অংশে ঐকমত্য হয়েছে, তা অবিলম্বে বাস্তবায়ন; বাহাত্তরের গণবিরোধী সংবিধান বাতিল করে গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ।

অবিলম্বে পিলখানা-শাপলা-জুলাই গণহত্যা ও গুম-খুনের বিচার; জুলাই গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও সহযোগীদের ফেরত এনে রায় কার্যকর এবং শহীদ ওসমান হাদীর খুনিদের ফেরত এনে বিচার করা; ভবিষ্যতে যাতে কেউ ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী আইন’ এবং শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ রক্ষায় ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন’ প্রণয়ন; গুম-খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডবিরোধী বাতিল হওয়া অধ্যাদেশকে নতুন আইন হিসেবে পাস করা; পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ ও জনপ্রশাসনকে গণমুখী, স্বদেশপ্রেমী ও দুর্নীতিমুক্ত করতে সংস্কার করা।

অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চীন ও মুসলিম বিশ্ব থেকে বিনিয়োগ গ্রহণ, তরুণদের জন্য বিনা সুদে ঋণ প্রদান, স্টার্টআপ গড়ে তুলতে বিনামূল্যে অফিস ও বিনা জামানতে প্রাথমিক মূলধন সরবরাহ, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের পরামর্শকে প্রাধান্য দিয়ে অপরিহার্য সংস্কার সাধন, ব্যাংক লুটেরাদের বিচার, সম্পদ বাজেয়াপ্ত, মালিকানা বাতিল এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা।

ভারতের সঙ্গে অসম সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে সমমর্যাদার ভিত্তিতে সৎ প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক স্থাপন, ভারতের সঙ্গে করা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী অসম দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলো বাতিল, ভারতে পাচার হওয়া গুম হওয়া বাংলাদেশিদের ফেরত প্রদান, সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা বন্ধ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতীয় হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং সন্ত্রাসবাদী ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পরিচালনায় ভারতের মাটি ব্যবহার বন্ধ করা।

সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ শামসুদ্দিন, সহকারী সদস্য সচিব গালীব ইহসান ও আবদুস সালাম, সদস্য সাইদুল ইসলাম, হাবিবুল্লাহ মারজান ও সাকিব সামিন; বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের আহ্বায়ক আবদুল ওয়াহেদ ও সদস্য সচিব ফজলুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য সচিব মুহিব মুশফিক খান, সহকারী সদস্য সচিব জিহাদী ইহসান ও মো. আরিফুল ইসলাম, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক মো. আরিফুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।