ফজলুর রহমান
ফজলুর রহমান।   ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি দেশের অভ্যন্তরে নানামুখী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের পাশাপাশি বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একটি বেসরকারি টেলিভিশনের দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান এই সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি, অতীত ইতিহাস এবং বর্তমান সংকট ও সম্ভাবনার বহুমাত্রিক দিক তুলে ধরেছেন।

আলোচনার শুরুতে সঞ্চালক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতা এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের আচরণের বৈপরীত্য নিয়ে প্রশ্ন তুললে অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান একাত্তরে ভারতের ভূমিকাকে ‘সর্বাত্মক সহযোগিতা’ হিসেবে অভিহিত করেন।

তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালে প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া, খাদ্য ও রসদ সরবরাহ এবং সরাসরি সামরিক সহযোগিতার বিষয়টি ছিল অভূতপূর্ব। তৎকালীন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর পাঠানো হয়েছিল, তখন তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের ইন্দিরা গান্ধী সরকার বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল। তিনি বলেন, এটি কেবল সাধারণ সহযোগিতা ছিল না, এটি ছিল সর্বাত্মক এক অবস্থান। তবে তিনি যোগ করেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘সারাজীবন কেউ কারো আপন থাকে না’ এবং সময়ের সাথে সাথে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্কের সমীকরণ বদলে যায়।

ভৌগোলিক বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ তিন দিক দিয়ে ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং ভারতের আয়তন বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ৩২ গুণ বড়। এ ধরনের দীর্ঘ বর্ডার বা সীমান্ত সংলগ্ন প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে কিছু দ্বিপাক্ষিক সমস্যা কিংবা সীমান্ত বিতর্ক তৈরি হওয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে খুব স্বাভাবিক। যেমনটি বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তেও দেখা যায়—তা সে মেক্সিকো-আমেরিকা সীমান্ত হোক, কিংবা চীন-ভারত বা পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান সংকটের জায়গা হলো অভিন্ন নদ-নদীর পানিবণ্টন। বরাক, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, তিস্তা ও গঙ্গার মতো প্রধান নদীগুলোর উৎসমুখ ভারতে অবস্থিত হওয়ায় পানি নিয়ে এক ধরনের টানাপোড়েন সবসময়ই বিদ্যমান। অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান মনে করেন, রাজনৈতিক সম্পর্কের চড়াই-উতরাই যাই থাকুক না কেন, অভিন্ন নদীগুলোর পানি ব্যবস্থাপনায় ভারতকে আরও বেশি সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব দেখিয়ে বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রাখতে হতো। কারণ রাষ্ট্র ও জাতির মধ্যকার প্রতিটি সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপরই নির্ভর করে।

সঞ্চালক উল্লেখ করেন যে, বিগত দুই বছরে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক আরও অবনতি হয়েছে এবং অনেকের মতেই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই বন্ধুত্ব সমতার ভিত্তিতে ছিল না; ভারত বাংলাদেশের ওপর অনেক কিছু চাপিয়ে দিয়েছিল।

এর জবাবে অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান বাস্তবসম্মত তথ্য ও প্রমাণ উপস্থাপনের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের ১৫ বছরে ভারতের সাথে করা চুক্তিগুলো নিয়ে নানা সমালোচনা বা আদানি গ্রুপের সাথে বিদ্যুৎ চুক্তি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, ঢালাওভাবে কেবল ভারতকে দোষারোপ করার প্রবণতা সঠিক নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই বিরোধকে কেন্দ্র করে অনেক সময় বিষয়টি রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা কাম্য নয়। আবেগ বা রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে দেশ চলে না; বাস্তবতা হলো দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আমদানি, যেমন তেল বা চাল আনা, ভারতের সাথে সম্পর্কের কারণেই সচল রয়েছে।

সম্প্রতি দেশের অভ্যন্তরে আইন-শৃঙ্খলা ও মব জাস্টিসের মতো অস্থিরতার পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে 'পুশ-ইন' বা অবৈধ অনুপ্রবেশ করানোর যে সমস্ত চেষ্টা চলছে, তা নিয়ে সঞ্চালক প্রশ্ন উত্থাপন করেন।

এই প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান বলেন, প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের এ ধরনের আচরণ করা মোটেও উচিত নয়। তাদের কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় নিশ্চিত করা উচিত যে তারা আসলেই বাংলাদেশের নাগরিক এবং বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো উচিত।

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের চতুর্দিকে বিস্তৃত এই বিশালাকার প্রতিবেশীর সাথে স্থায়ী কোনো বৈরিতা দেশের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর। অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান মনে করেন, রাজনৈতিক ফায়দা বা ভোটার বাড়ানোর উদ্দেশ্যে কোনো দল বা গোষ্ঠী প্রতিবেশী দেশের সাথে শত্রুতার কথা বলতেই পারে, কিন্তু যারা দেশ চালাবে বা রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকবে, তাদের বাস্তবতার মাটিতে পা রেখে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পথ খুঁজতে হবে।

একই সাথে তিনি ভারতের দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, বড় দেশ হিসেবে ভারতকেও চিন্তা করতে হবে কীভাবে তার একটি ছোট প্রতিবেশীর সাথে ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা যায়। এই সম্পর্ক কখনো ‘মালিক ও দাসের’ মতো হওয়া উচিত নয়, বরং এটি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে।