কয়লাই এখন ব্যাটারির ভবিষ্যৎ!
কয়লাই এখন ব্যাটারির ভবিষ্যৎ।   ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীজুড়ে যখন কয়লাকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি চলছে, ঠিক তখনই চীনা বিজ্ঞানীরা এই পুরনো খনিজকে দিলেন সম্পূর্ণ নতুন একটি পরিচয়। জ্বালানো নয়—এবার কয়লা ব্যবহার হবে ব্যাটারি বানাতে।

চীনের ন্যাশনাল এনার্জি গ্রুপের গবেষকরা কয়লা থেকে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির অ্যানোড তৈরিতে সফল হয়েছেন। কয়লার ভেতরে থাকা গ্রাফিন ও বিশেষ ধরনের কার্বন উপাদানকে একত্রিত করে তারা এমন একটি কাঠামো তৈরি করেছেন, যা আগের সিলিকন-ভিত্তিক অ্যানোডের তুলনায় অনেক বেশি টেকসই ও কার্যকর।

ব্যাটারির ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রধান অংশ থাকে—ক্যাথোড ও অ্যানোড। চার্জ দেওয়ার সময় লিথিয়াম আয়ন অ্যানোডে জমা হয় এবং ব্যবহারের সময় সেখান থেকে বের হয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। তাই অ্যানোড যত ভালো, ব্যাটারি তত শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী। এতদিন গ্রাফাইট ও সিলিকন দিয়ে অ্যানোড বানানো হতো। গ্রাফাইটের চার্জ ধারণক্ষমতা কম, আর সিলিকন ফুলে গিয়ে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়—এই দুই সমস্যার সমাধানই খুঁজছিলেন বিজ্ঞানীরা।

কয়লা আসলে কার্বনের এক জটিল কাঠামো। এর ভেতরে স্বাভাবিকভাবেই গ্রাফিন স্তর ও অ্যামোরফাস কার্বন থাকে। বিজ্ঞানীরা বিশেষ প্রক্রিয়ায় এই দুটিকে একত্রিত করে “কার্বন-কার্বন নেটওয়ার্ক” তৈরি করেছেন, যা সিলিকনের মতো ফুলে যায় না, আবার গ্রাফাইটের চেয়ে অনেক বেশি শক্তি ধারণ করতে পারে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, কয়লা পৃথিবীতে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় এবং এর দাম অত্যন্ত কম—ফলে উৎপাদন খরচ অনেকটাই কমে আসবে।

ফলাফল হিসাবে সিলিকন অ্যানোডের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল বারবার চার্জ দিতে দিতে ইলেকট্রোড ফুলে যাওয়া। নতুন এই উপাদানে সেই ফোলার হার ১০৯% থেকে মাত্র ৪১%-এ নেমে এসেছে। ব্যাটারির আয়ুষ্কাল বেড়েছে প্রায় ৯ গুণ এবং চার্জিং গতি বেড়েছে ৩ গুণ। অর্থাৎ যে ফোনে আগে ১ ঘণ্টা চার্জ লাগত, ভবিষ্যতে হয়তো ২০ মিনিটেই হবে।

ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় প্রয়োগ হবে ইলেকট্রিক গাড়িতে। বর্তমানে ইভি ব্যাটারির দুর্বলতা হলো চার্জ দিতে বেশি সময় লাগা এবং বারবার চার্জের পর ক্ষমতা কমে যাওয়া। কয়লা-ভিত্তিক অ্যানোড এই দুটি সমস্যাই অনেকটা কমিয়ে আনতে পারে। এছাড়া সৌর ও বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য শক্তি সঞ্চয়ের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, কারণ এই উৎসগুলো সবসময় বিদ্যুৎ দেয় না—বড় ব্যাটারিতে জমিয়ে রাখতে হয়।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী Journal of Power Sources-এ এবং বিশেষজ্ঞ মহলে বেশ সাড়া ফেলেছে।

ভাবুন একবার—যে কয়লা পুড়িয়ে বায়ু দূষণ করা হতো, সেই কয়লাই হয়তো একদিন আমাদের ইলেকট্রিক গাড়ি চালাবে, সৌরশক্তি ধরে রাখবে। দূষণের উৎস থেকে সবুজ শক্তির সহায়ক—কয়লার এই রূপান্তর সত্যিই অবাক করার মতো।

সূত্র: জার্নাল অফ পাওয়ার সোর্সেস