বিশ্বের পঞ্চম সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট মাকালুর চূড়ায় বাবর আলী।
বিশ্বের পঞ্চম সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট মাকালুর চূড়ায় বাবর আলী।   ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের পর্বত অভিযানের ইতিহাসে আজ আরেকটি ঐতিহাসিক দিন হিসেবে চিহ্নিত হলো। হিমালয়ের দুর্গম পথে লড়াই করে বিশ্বের পঞ্চম সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট মাকালুর চূড়ায় পৌঁছেছেন দেশের সাহসী সন্তান বাবর আলী। শনিবার (২ মে) ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে তিনি ৮ হাজার ৪৮৫ মিটার উচ্চতার এই পর্বতটির শীর্ষে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা ওড়ান।

এই সাফল্যের মাধ্যমে তিনি প্রথম এবং একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে পৃথিবীর ১৪টি আট-হাজারি শৃঙ্গের মধ্যে পাঁচটি জয় করেছেন। বাবর আলী মাকালুর শীর্ষে পৌঁছানোর পর প্রায় সাড়ে আট ঘণ্টার কঠোর পরিশ্রমের ফলস্বরূপ এই সফল অভিযানটি সম্পন্ন করেন।

‘এক্সপিডিশন মাকালু: দ্য ফিফথ ফ্রন্টিয়ার’ শীর্ষক এই অভিযানের আয়োজন করে পর্বতারোহণ ক্লাব ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স’। ক্লাবটির সভাপতি ফরহান জামান নেপালের আউটফিটার ‘মাকালু অ্যাডভেঞ্চার’-এর স্বত্বাধিকারী মোহন লামসালের বরাতে বাবরের মাকালু শৃঙ্গে আরোহণের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

মাউন্ট মাকালু অভিযানে বাবর আলীর সঙ্গে ছিলেন অভিজ্ঞ শেরপা আং কামি। বর্তমানে বাবর আলী চূড়া থেকে নিচে নেমে আসার পথে রয়েছেন। তবে পর্বতারোহণের ক্ষেত্রে চূড়ায় ওঠা যতটা গৌরবের, নেমে আসাও ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই, তার সহযাত্রীরা দেশবাসীর কাছে বাবর আলীকে নিরাপদে বেসক্যাম্পে ফিরিয়ে আনার জন্য দোয়া চেয়েছেন।

মাউন্ট মাকালু নেপালের মহালঙ্গুর হিমালয় অঞ্চলে অবস্থিত এবং এর পিরামিড আকৃতির শৃঙ্গটি পর্বতারোহীদের কাছে ‘গ্রেট ব্ল্যাক ওয়ান’ নামে পরিচিত। এর ভৌগোলিক গঠন এমন, যে আশেপাশে বড় কোনো পাহাড় না থাকায় প্রচণ্ড বাতাসের কারণে বরফ সরে গিয়ে পাহাড়ের কালো পাথর বেরিয়ে আসে, যা এর নামকরণে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। বাবর আলী তার অভিযানের নাম দিয়েছেন ‘এক্সপেডিশন মাকালু: দ্য ফিফথ ফ্রন্টিয়ার’।

এ বছরের ৭ এপ্রিল বাবর আলী এই অভিযানের প্রস্তুতি নিতে নেপাল পৌঁছান। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষে ৯ এপ্রিল তিনি উড়ে যান টুমলিংটার, সেখান থেকে গাড়িতে পৌঁছান সেদুয়া গ্রামে। এরপর পায়ে হেঁটে ১৮ এপ্রিল পৌঁছান উচ্চতর বেজক্যাম্পে।

উচ্চতার সঙ্গে শরীর মানিয়ে নিতে ২১ এপ্রিল ক্যাম্প-১ এবং পরদিন ক্যাম্প-২ এ অবস্থান করেন তিনি। প্রায় ৭ হাজার মিটার উচ্চতা স্পর্শ করে পরে নেমে আসেন বেজক্যাম্পে। দ্বিতীয় দফায় ২৭ এপ্রিল আবারো উঠে ক্যাম্প-২-এ একদিন কাটিয়ে পরদিন নেমে আসেন। এরপর শুরু হয় অনুকূল আবহাওয়ার অপেক্ষা।

৩০ এপ্রিল আবহাওয়া অনুকূলে এলে আবার অভিযানে নামেন বাবর। সেদিনই পৌঁছে যান ৬ হাজার ৬০০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প-২-এ, পরদিন ওঠেন ৭ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প-৩-এ। সেখান থেকে রাতেই শুরু করেন চূড়ান্ত আরোহন। টানা ১ হাজার ১০০ মিটারেরও বেশি বিপজ্জনক খাড়া পথ পেরিয়ে ভোরে পৌঁছান শিখরে।

অভিযান-ব্যবস্থাপক ফরহান জামান জানিয়েছেন, বাবর আজ ক্যাম্প-২ এ এবং আগামীকাল ৩ মে বেসক্যাম্পে ফিরে আসবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে এটি তার প্রথম বড় অর্জন নয়। এর আগে তিনি একের পর এক আন্তর্জাতিক মানের পর্বত জয় করে নিজেকে পর্বত অভিযানের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ২০২২ সালে তিনি আমা দাবালাম পর্বত জয় করেন। এরপর ২০২৪ সালে মাউন্ট এভারেস্ট এবং লোৎসে আরোহণ করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন। ২০২৫ সালে তিনি প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে অন্নপূর্ণা-১ পর্বত জয় করেন এবং ওই বছরের শেষে কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই মাউন্ট মানাসলুর শীর্ষে পৌঁছান।

বাবর আলী এই অসাধারণ সাফল্য দিয়ে বাংলাদেশের পর্বত অভিযানের ইতিহাসে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছেন।