দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় লোডশেডিং পরিস্থিতি ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে।
দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় লোডশেডিং পরিস্থিতি ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে।   ছবি: সংগৃহীত

দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় লোডশেডিং পরিস্থিতি ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। এপ্রিলের শুরু থেকেই এ সংকট নতুন মাত্রা পেয়েছে এবং মে–জুন মাসে তা আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (২০ এপ্রিল) সন্ধ্যায় বিদ্যুতের চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ১৫ হাজার ৩৩০ মেগাওয়াট, যার বিপরীতে ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৩৫৮ মেগাওয়াট। একই দিনে সর্বোচ্চ লোডশেডিং পৌঁছায় ১ হাজার ৯৩২ মেগাওয়াটে। সাম্প্রতিক কয়েক দিনের তথ্য বলছে, এই ঘাটতি প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য মতে, টানা তিন দিনে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল যথাক্রমে ৩৬.৩, ৩৬.৬ এবং ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অন্যদিকে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-এর তথ্য অনুযায়ী, এই সময় প্রতিদিনই লোডশেডিং প্রায় ১৯০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি ছিল।

তাপমাত্রা বাড়ার ফলে আবাসিক খাতে পাখা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও অন্যান্য শীতলীকরণ সরঞ্জামের ব্যবহার বেড়েছে। পাশাপাশি বোরো মৌসুমে সেচের চাহিদা বৃদ্ধি এবং শিল্প খাতে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বাড়ায় সামগ্রিক চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। কিন্তু উৎপাদন সেই হারে বাড়ানো সম্ভব না হওয়ায় বিদ্যুৎ ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের মূল সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তাদের নির্দেশনায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন করে পাওয়ার গ্রিড পিএলসি বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। আর ছয়টি বিতরণ সংস্থা গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ দেয়, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। এ তিন সংস্থার তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয় ২ হাজার ৫০৬ মেগাওয়াট, যার মধ্যে ২ হাজার ২২৯ মেগাওয়াট ছিল আরইবির। কেন্দ্রীয় হিসাবে ২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয় ১ হাজার ৮৯০ মেগাওয়াট। যদিও আরইবির তথ্য, তাদের লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ১১ মেগাওয়াট।

২০২৫ সালের এপ্রিল মাসের লোডশেডিংয়ের তথ্য সংরক্ষণ করতে পারেনি আরইবি। এ বছরের ২০ এপ্রিল ১ হাজার ৮৪০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে বলে তথ্য প্রকাশ করেছে পিজিসিবি। অথচ একই সময়ে আরইবির লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৮৯৭ মেগাওয়াট। 

পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাবস্টেশন পর্যায়ে দৈনিক গড় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৫ হাজার ৫০০ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট হলেও প্রকৃত উৎপাদন হচ্ছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। ফলে গড়ে ১ থেকে ২ হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা পিক সময়ে আরও বেড়ে যায়। সোমবার সন্ধ্যার পিক সময়ে চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট, বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ১৯৮ মেগাওয়াট, ফলে লোডশেডিং করতে হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯১২ মেগাওয়াট।

অঞ্চলভেদে লোডশেডিংয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্য দেখা যাচ্ছে। বরিশাল অঞ্চলে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না এবং দিনে ৮ থেকে ১০ বার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়। রাজশাহী অঞ্চলে দিনে ৬ থেকে ৮ বার বিদ্যুৎ চলে গিয়ে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত সরবরাহ বন্ধ থাকে। খুলনা অঞ্চলে প্রতিদিন ৬ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, যা শিল্প উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। চট্টগ্রামের গ্রামীণ এলাকাগুলোতে দিনে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলেও কিছু এলাকায় ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না।

ঢাকা বিভাগে শহরের বাইরে গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ে দিনে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং হলেও ঢাকা শহরে তা তুলনামূলক কম, গড়ে ১ থেকে ২ ঘণ্টা। কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, সিলেট ও রংপুর অঞ্চলেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট অব্যাহত রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পিক সময়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের বড় একটি অংশ ঢাকায় সরবরাহ করা হয়, ফলে অন্যান্য অঞ্চলে সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

চট্টগ্রামে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয়বার বিদ্যুৎ যায়। একেকবার আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। তবে শহরের বাইরে গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও খারাপ। লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ইকবাল হোছাইন বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা কঠিন হচ্ছে।

চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ বলেন, তাঁদের এলাকায় প্রতিদিন চাহিদার তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।

লোডশেডিংয়ের কারণে দেশের বিভিন্ন জেলায় কৃষি সেচ ব্যাহত হচ্ছে এবং বোরো মৌসুমে সেচ পাম্প চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। গাজীপুর শিল্পাঞ্চলেও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সেখানে ৪৮৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৩১২ মেগাওয়াট, ফলে প্রতিদিন ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এর প্রভাব তৈরি পোশাক কারখানা, তাঁত শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে পড়ছে এবং উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

সরকারি হিসাবে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার ৪৯৪ মেগাওয়াট। গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ চাহিদা সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে সামনের দিনে লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।

সব মিলিয়ে, তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে জনজীবন, কৃষি ও শিল্প-সব খাতেই চাপ বাড়ছে।