ঢাকার গণপরিবহন।
ঢাকার গণপরিবহন।   ছবি: সংগৃহীত

সরকার সব ধরণের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। শনিবার (১৮ এপ্রিল) থেকে কার্যকর নতুন দামে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা এবং পেট্রলের দাম ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এক লাফে এভাবে দাম বৃদ্ধিকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় সমন্বয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি হলেই গণপরিবহনের ভাড়াও বাড়ানো হয়। আবার দাম কমানো হলে যাত্রীর চাপে কমানোও হয় ভাড়া। তবে যেই হারে ভাড়া বাড়ানো হয়, সেই তুলনায় ভাড়া কমানোর আনুপাতিক হারে রয়েছে বিশাল তফাৎ। রবিবার (১৯ এপ্রিল) ভাড়া বাড়ানোর জন্য বিআরটিএর সাথে বৈঠক করেন বাস মালিকরা। নিয়ম অনুযায়ী তেলের দাম লিটার প্রতি ১৫ টাকা বাড়ানোর বীপরীতে কিলোমিটার প্রতি ১৫ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর কথা থাকলেও এর সাথে আরো আনুসাঙ্গিক ব্যয় হিসেব করে আরো ভাড়া বাড়াতে চান বাসমালিকরা। ফলে সিদ্ধান্ত ছাড়াই এই বৈঠক শেষ হয়। এ নিয়ে আরেক দফা বৈঠক হয় সোমবার (২০ এপ্রিল)। এবারও কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয় বৈঠক। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ড. জাহেদুর রহমান মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) বলেছেন, 'জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সমন্বয় করে বাসের যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ করা হবে, প্রয়োজনে এসি বাসের ভাড়া কয়েক স্তরে নির্ধারণ করা হতে পারে।' অর্থাৎ ভাড়া কত বাড়ানো হবে এ নিয়ে নানা সংকোচ থাকলেও ভাড়া যে বাড়ছেই এটা এখন নিশ্চিত।

তবে ভাড়া বাড়ানোর ক্ষেত্রে অতি উৎসাহী থাকলেও কমানোর ক্ষেত্রে পুরোপুরি নিরুৎসাহিত থাকেন বাস মালিকরা। ২০২২ সালের ৫ আগস্ট ডিজেলের দাম প্রতি লিটার একলাফে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করেছিল সরকার। নিয়ম অনুযায়ী কিলোমিটার প্রতি ভাড়া ৩৪ পয়সা বাড়ানোর কথা থাকলেও ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়িয়ে দেন পরিবহনমালিকরা। ফলে সেবার সরকারী হস্তক্ষেপে ভাড়া ৪০ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে ঠিক ২৪ দিন পর ডিজেল লিটারপ্রতি ৫ টাকা কমায় সরকার। সেই হিসেবে গণপরিবহণে ভাড়া কিলোমিটার প্রতি ৫ পয়সা কমানোর জন্য মালিকপক্ষকে বলা হয় সরকার থেকে। কিন্তু সে সিদ্ধান্ত মানেন নি বাসমালিকরা। 

এরপর ২০২৪ সালের ১লা এপ্রিল ডিজেলের দাম আরো ৩ টাকা কমানো হয় এবং নিয়ম অনুযায়ী বাসের ভাড়া কিলোমিটার প্রতি ৩ পয়সা কমাতে বলা হয় বাসমালিকদের, তবে এবারো সেই সিদ্ধান্ত মানেন নি বাসমালিকেরা। অতএব দুই দফায় ডিজেলের দাম ৮ টাকা কমলেও বাসের ভাড়া অপরিবর্তিত থাকে। অর্থাৎ তেলের দাম বাড়লে বাসের ভাড়া বেড়েছে ঠিকই কিন্তু বিগত প্রায় ১৪ বছরে কমানোর ক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্ত মানেই নি গণপরিবহন গুলো। 

অন্যদিকে, তেলের দামের পাশাপাশি ভাড়া বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অন্যান্য ব্যায় বিবেচনা করা হয়। রবিবার বিআরটিএর সাথে বৈঠকে বাসমালিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ২০২২ সালের পর বাস-মিনিবাসের ব্যয় বিশ্লেষণ করা হয়নি। এর মধ্যে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে খুচরা যন্ত্রাংশ ও ইঞ্জিন অয়েলের খরচ বেড়েছে। সেটাও আমলে নিতে হবে। সরকারীভাবে যে ব্যয় নির্ধারণ করে ভাড়া বাড়ানো হয় তার সাথে বাস্তব চিত্র পুরোপুরি আলাদা। বেশিরভাগ বাসেরই ফিটনেস নেই। বিআরটিএর মতে প্রতিটি বাসের মুল্য ধরা হয়েছে ৩৫ লাখ টাকা ও ৫ বছর পর রেনোভেশনের খরচ ছয় লাখ টাকা। তবে বাস্তবে ঢাকা মহানগরে একটিও ৩৫ লাখের বাস খুজে পাওয়া যায় না, আর রেনোভেশন সংক্রান্তও তেমন কোন খরচ করেন না মালিকপক্ষ। আবার এই ভাড়া বৃদ্ধির বিবেচনায় গ্যারেজ এবং কর্মচারীদের বেতন ও বোনাস হিসেবে মোটা অঙ্কের ব্যয় দেখানো হয়। তবে বাস্তবে এই ব্যয় এর ও কোন প্রয়োগ করেন না মালিকপক্ষ। বরং রাস্তার পাশেই রাখা হয় বাস আর কর্মচারীদের পারিশ্রমিক দিন হিসেবে প্রতিদিন পরিশোধ করা হয়। এমতাবস্থায় ভোক্তারা একে এক প্রকার ডাকাতি বলে উল্ল্যেখ করেছেন। 

রবিবার (১৯ এপ্রিল) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী অভিযোগ করে বলেন, ‘জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে পুঁজি করে বাস মালিক সমিতির সরকার সমর্থিত প্রভাবশালী নেতারা অতীতের ফ্যাসিস্ট সরকারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সরকারের সঙ্গে মিলে একচেটিয়া ভাড়া বৃদ্ধির পাঁয়তারা করছে।’ তিনি বলেন, ‘তিন দফা জ্বালানি তেলের দাম তিন টাকা হারে কমানোর পরিপ্রেক্ষিতে বাস ভাড়া তিন পয়সা হারে কমানো হয়েছে; দুই টাকা কমানোর পরিপ্রেক্ষিতে দুই পয়সা হারে কমানো হয়েছে। এবার প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বৃদ্ধি হয়েছে। কাজেই আগের হিসাবে বাস ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৫ পয়সা বৃদ্ধি হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমলাতন্ত্রকে ম্যানেজ করে অতিরিক্ত ভাড়া বৃদ্ধি করা হলে সরকারের জনপ্রিয়তায় কমবে, জনরোষ তৈরি হবে।’