হালখাতা, ঐতিহ্যবাহী হালখাতার জাঁকজমক কমছে
বৈশাখের অন্যতম অনুসঙ্গ হালখাতা ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আবেদন হারাচ্ছে।   ছবি: আরটিএনএন

হালখাতা- নামটা শুনলেই চোখে সামনে ভেসে ওঠে লালসালুর বাঁধাই করা মোটা খাতা, মিষ্টির প্যাকেট আর মুড়ি-মুড়কির মিষ্টি সুবাস। এক সময় পয়লা বৈশাখ মানেই ছিল ব্যবসায়ীদের উৎসব আর পাওনা টাকা আদায়ের একটা অন্যতম মাধ্যম। মোগল সম্রাট আকবরের সময় খাজনা আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল এই হালখাতার। কিন্তু কালের বিবর্তনে আর প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সেই ঐতিহ্যের জৌলুস এখন ম্লান হতে বসেছে।

এক সময় গ্রাম-গঞ্জ থেকে শুরু করে পুরান ঢাকার অলিগলিতে বৈশাখের প্রথম সকালে ধুম পড়ে যেত হালখাতার। বর্তমানে আধুনিকতা আর ডিজিটাল লেনদেনের ভিড়ে হালখাতার সেই উৎসবটি টিকে থাকার লড়াই করছে। নববর্ষের ঐতিহ্যবাহী অনুষঙ্গ 'হালখাতা' ঘিরে যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যেত, তা এখন কেবলই নিয়ম রক্ষার আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। ডিজিটাল যুগের প্রভাবে লাল মলাটের সেই সাবেকি আভিজাত্য এখন অনেকটাই ম্লান, যেন কোনোমতে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক নিরন্তর লড়াই।

কম্পিউটার সফটওয়্যার, এক্সেল শিট আর মোবাইল অ্যাপ এখন মোটা খাতার জায়গা দখল করে নিয়েছে। এছাড়া ব্যবসায়ীরা হাতে লিখে হিসাব রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। আগের দিনে দেনাদার সরাসরি টাকা পরিশোধ করতে আসলে মিষ্টিমুখ করাতো। বর্তমান সময়ে অনলাইন পেমেন্ট আর ডিজিটাল লেনদেনের ফলে দোকানে গিয়ে আড্ডা আর মিষ্টিমুখের সেই বাধ্যবাধকতা কমেছে।

কর্পোরেট জগতে কোম্পানিগুলো হালখাতা না করে বার্ষিক ক্লোজিংয়ের মাধ্যমে পাওনা টাকা আদায় করে থাকে যেখানে উৎসবের চেয়ে পেশাদারিত্ব বেশি প্রাধান্য পায়।

ঐতিহ্যের হালখাতা কেবল পাওনা আদায়ের মাধ্যম ছিল না, এটি ছিল ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে একটি সৃজনশীল সামাজিক সেতুবন্ধন। হালখাতায় দাওয়াত কার্ড পাওয়া ছিল সম্মানের বিষয়। দোকানে গিয়ে বসা, মিষ্টি খাওয়া আর কুশল বিনিময় করার মাধ্যমে যে হৃদ্যতা তৈরি হতো, তা বর্তমানের যান্ত্রিক লেনদেনে অনুপস্থিত।

যাত্রাবাড়ীর স্বর্ণালী জুয়েলার্সের মালিক মেহেদি হাসান জানান, আগে অনেক বড় করে অনুষ্ঠান করতাম। বর্তমানে ব্যবসায়িক মন্দা আর আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে পুরোনো ঐতিহ্যের সেই জাঁকজমক উৎসবমুখর দৃশ্যপট আজ কেবল স্মৃতিতেই টিকে আছে।

রাজধানী সুপার মার্কেটের পায়েল জুয়েলার্সের কর্ণধার বাবুল আহমেদ আরটিএনএন-কে জানান, সকাল থেকেই মার্কেটে বসে আছি। ক্রেতাদের জন্য আয়োজনও করেছি- তবে আশানুরূপ ক্রেতা আসছেন না। রোদ কমলে বিকেলের দিকে হয়তো আসবেন।

বায়তুল মোকাররমের হজসামগ্রী বিক্রেতা আল-ইসলাম ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী হাজী মো. মহিব উল্ল্যাহ রাজু খান আরটিএনএনকে বলেন, ‘বাকিতে বিক্রয় করা ক্রেতাদের লিস্ট আছে। বিগত কয়েক বছর কার্ড ছাপিয়ে ক্রেতাদের দাওয়াত দিয়ে হালখাতার অনুষ্ঠান করেছি। এবার ক্রেতাদের আগ্রহও কম থাকায় দাওয়াতপত্র বানানো হয়নি। আমাদের কাছে হালখাতা মানে পুরোনো খাতা বদলে নতুন খাতায় হিসাব তোলা।’