বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐক্যের প্রতীক পয়লা বৈশাখ আজ
পুরোনো বছরের গ্লানি ও ব্যর্থতা পেছনে ফেলে নতুন প্রত্যয়, আশা ও সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে এসেছে এই নববর্ষ।   ছবি: সংগৃহীত

বাঙালির প্রাণের উৎসব পয়লা বৈশাখ আজ। হাজার বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক এই দিনটি নতুন বছর ১৪৩৩ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নিতে আবারও একত্র করেছে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে। পুরোনো বছরের গ্লানি ও ব্যর্থতা পেছনে ফেলে নতুন প্রত্যয়, আশা ও সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে এসেছে এই নববর্ষ।

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে দিনব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসবটি পালিত হবে। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই ছায়ানট-এর আয়োজনে রমনার বটমূলে শুরু হবে ঐতিহ্যবাহী প্রভাতি অনুষ্ঠান। এবারের মূল ভাবনা ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’। প্রায় দুই শতাধিক শিল্পীর অংশগ্রহণে রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, লালন ও লোকগানের সমন্বয়ে সাজানো হয়েছে এবারের আয়োজন, যা সরাসরি সম্প্রচার করা হবে টেলিভিশন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে।

পহেলা বৈশাখ

একইসঙ্গে সকাল নয়টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ-এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত বৈশাখী শোভাযাত্রা। এবারের প্রতিপাদ্য ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। যার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজে ঐক্য, সম্প্রীতি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবনের আহ্বান জানানো হবে। শোভাযাত্রায় স্থান পাবে গ্রামীণ জীবন, লোকঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নানা প্রতীকী মোটিফ কাঠের হাতি, টেপা পুতুল, শান্তির পায়রা, মোরগ, দোতারা, বাঘ, ময়ূরসহ বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি ও মুখোশ। রঙিন সাজসজ্জা ও সৃজনশীল উপস্থাপনায় শোভাযাত্রাটি হয়ে ওঠে বাঙালির ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

রাজধানীর ধানমন্ডিতেও বর্ষবরণ পর্ষদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হবে বৈশাখী শোভাযাত্রা ও দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ‘জাগাও পথিকে, ও সে ঘুমে অচেতন’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে গান, আবৃত্তি, নৃত্য ও মূকাভিনয়ের মাধ্যমে তুলে ধরা হবে সামাজিক সচেতনতা ও সাংস্কৃতিক জাগরণের বার্তা। শিশুদের সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত ও বৈশাখের গান দিয়ে শুরু হয়ে এই আয়োজন সন্ধ্যা পর্যন্ত চলবে।

পয়লা বৈশাখকে ঘিরে দেশের শহর ও গ্রামজুড়ে বসেছে বৈশাখী মেলা। পান্তা-ইলিশ, নাগরদোলা, লাঠিখেলা, বলিখেলা ও গ্রামীণ নানা খেলাধুলায় মুখর হয়ে উঠেছে জনপদ। চট্টগ্রামে ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলিখেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা শতবর্ষের ইতিহাস বহন করে।

বাংলা নববর্ষের ইতিহাসও সমৃদ্ধ ও তাৎপর্যপূর্ণ। অধিকাংশ গবেষকের মতে, সম্রাট আকবর-এর সময় কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সুবিধার্থে বাংলা সনের প্রবর্তন হয়। পরে ‘ফসলি সন’ থেকে ‘বঙ্গাব্দ’ নামে পরিচিতি পাওয়া এই পঞ্জিকা ধীরে ধীরে বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। জমিদারি প্রথার ‘হালখাতা’ থেকে শুরু করে আজকের সর্বজনীন উৎসব এই দীর্ঘ পথচলায় নববর্ষ হয়ে উঠেছে বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রতীক।

পহেলা বৈশাখ

১৯৪৭ সালের পর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জের মুখেও পয়লা বৈশাখ বাঙালির জাতীয় চেতনার অন্যতম বাহক হিসেবে শক্ত অবস্থান তৈরি করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক সর্বজনীন উৎসবে রূপ নেয়, যা আজ দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তারা এ উৎসবকে ঐক্য, সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করে নতুন বছরে উন্নয়ন, শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।

নতুন বছরের এই প্রভাতে বাঙালি আবারও উচ্চারণ করছে চিরন্তন আহ্বান- অশুভ শক্তির বিনাশ হোক, মানবতার জয় হোক। পয়লা বৈশাখ শুধু নতুন বছরের সূচনা নয়, বরং নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন ও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের এক অনন্য মুহূর্ত। 

এসএস/আরটিএনএন