ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান চললেও আবার দখল হয়ে যায়।
ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান চললেও আবার দখল হয়ে যায়।   ছবি: আরটিএনএন

রাজধানীর ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করার অভিযান যেন এক চক্রাকার বাস্তবতায় আটকে গেছে। সকালে উচ্ছেদ অভিযান চললেও বিকেলে পুনরায় দখল হয়ে যাচ্ছে সেটি। এতে একদিকে যেমন জনদুর্ভোগ কমছে না, অন্যদিকে উচ্ছেদের আড়ালে নতুন করে উঠছে চাঁদাবাজির অভিযোগ।

সম্প্রতি রাজধানীর গুলিস্তানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানে সাময়িক স্বস্তি মিললেও তা স্থায়ী হয় নি। কোথাও দিনের ব্যবধানে কোথাও বা কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আবারও ফুটপাত ও সড়ক দখল করে বসেন হকাররা। ফলে নগর ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী সমাধানের অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে।

রূপ বদলায় না

সরেজমিনে দেখা গেছে, সকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পর ফুটপাত কিছুটা ফাঁকা থাকলেও বিকাল গড়াতে না গড়াতেই একে একে ফিরে আসেন হকাররা। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররম, পল্টন, কাপ্তানবাজার, ফুলবাড়িয়া ও বংশাল এলাকায় বিকেলের দিকে ফের জমে ওঠে অস্থায়ী দোকানের সারি।

এভাবে ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীদের বাধ্য হয়ে আগের মতই সড়কে হাঁটতে হচ্ছে। এতে থেকে যাচ্ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং যানজটকে করছে আরও তীব্র।

পেট নিষেধাজ্ঞা মানে না!

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যাত্রাবাড়ীর এক হকার সংবাদমাধ্যম আরটিএনএন’কে বলেন, ‘এই ঘন ঘন উচ্ছেদ অভিযান আমরা এখন আর কেয়ার করি না। আমাগো সংসার আছে, পেট আছে আগে সেটা বাঁচাতে হবে’।

যাত্রাবাড়ী ফুটপাতে ফল বিক্রেতা নাঈম আরটিএনএন’কে বলেন, শুধু  উচ্ছেদ অভিযান করে কখনোই ফুটপাত খালি করতে পারবে না। এদেশের লক্ষ লক্ষ পরিবার ফুটপাতে ব্যবসা-বানিজ্যের মাধ্যমে জীবনধারণ করে। উচ্ছেদ করতে হলে এতগুলো মানুষের কথা মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলেও উল্লেখ করেন নাঈম।

গুলিস্তানের হকার মো. আবুল কালাম বলেন , “অভিযানে দোকান উঠে গেলেও পেটের দায়ে আবার বসতে হয়। কিন্তু সবসময় ভয় কাজ করে- কখন আবার উচ্ছেদ হবে এবং মালামাল নষ্ট হবে‘। একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন গুলিস্তানের ফল বিক্রেতা সাহাবুউদ্দীন, “একদিন না বসলে সংসার চলে না। তাই ঝুঁকি নিয়েই বসতে হয়।”

মতিঝিল ফুটপাতে জুতা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন মো. সবুর। ‘তিনি আরটিএনএন’কে বলেন, “লক্ষ লক্ষ হকারদের পরিবারে প্রায় কোটির মতো সদস্য। হঠাৎ উচ্ছেদ অভিযানে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দিলে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কপালে কি হবে, সেটাও সরকারকে চিন্তা করতে হবে”।

এই বাস্তবতায় স্পষ্ট হয়, জীবিকার তাগিদ হকারদের বারবার ফুটপাতে ফিরিয়ে আনছে, যদিও তারা জানেন যেকোনো সময় অভিযান হতে পারে। তাছাড়া জনগণ তুলনামূলক কম টাকায় কেনাকাটা করতে অধিকাংশ সময় ফুটপাতের হকারদের বেছে নেয়। বলা যায় জীবিকা ও সাশ্রয়- এ দুই জরুরতের মেলবন্ধনে হকার উচ্ছেদ স্থায়ী রূপ পায় না।

নতুন চাঁদাবাজির সুযোগ!
চলতি মাসের শুরুতে গুলিস্তান, কাপ্তানবাজার, ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড, বকশীবাজার, চানখাঁরপুল এবং বংশাল এলাকায় পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়। এর আগে গত ২৩ মার্চ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাজধানীতে অনেক রেস্তোরাঁ, ওয়ার্কশপ, দোকান- ফুটপাত ও সড়ক দখল করে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এতে পথচারীদের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং সড়কে যানজট ও নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের অভিযোগ, উচ্ছেদ অভিযানের আড়ালে একটি অসাধু চক্র সক্রিয় হয়ে উঠছে, যারা হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হযরত আলী বলেন, “বিকল্প ব্যবস্থা না দিয়ে উচ্ছেদ করা অন্যায়। এতে হকাররা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি চাঁদাবাজির সুযোগও তৈরি হচ্ছে।”

বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রায় ৫ লাখ হকার রয়েছে, যাদের একটি বড় অংশ বহু বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। হঠাৎ উচ্ছেদে তাদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়ে এবং অনেকেই বেকার হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন।

সমাধানের পথ কোথায়?

স্থায়ী সমাধান কেন আসছে না, জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মো. আনিছুর রহমান বলেন, “শুধু পুলিশের পক্ষে বিষয়টি একা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”

শহরে হকার সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান কোন পথে, জানতে চাইলে বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী ও নগর পরিকল্পনাবিদ ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলাম সংবাদমাধ্যম আরটিএনএন’কে বলেন, “সকালে উচ্ছেদ আবার বিকেলেই হকারদের রাস্তা দখল করা টোটাল বিষয়টি ইকো সিস্টেমের সাথে সম্পর্কিত। সাধারণত নিম্ন আয়ের মানুষগুলো যাদের অঢেল বিনিয়োগ করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মার্কেটে দোকান নেওয়ার মত সামর্থ্য নেই তারাই রাস্তার ফুটপাতে ছোটখাটো ব্যবসা করে জীবন ধারণ করে। সুতরাং হঠাৎ করে তাদেরকে উঠিয়ে দিলে পুরো ইকোসিস্টেমের উপর একটা মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে তারা পুনরায় রাস্তায় এসে ব্যবসা করতে বাধ্য হয়। সুতরাং এর যৌক্তিক সমাধানে অবশ্যই পুরো ইকো সিস্টেম নিয়েই কাজ করতে হবে।”

 তিনি আরও বলেন, “একটা বিশাল জনগোষ্ঠী কম টাকায় কেনাকাটা করতে চায়। আর এক্ষেত্রে তাদের প্রথম ও প্রধান পছন্দ ফুটপাত। এক্ষেত্রে এই জনগোষ্ঠীর সমর্থনও হকাররা পায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হচ্ছে- একটা প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল এই ফুটপাতকে জিইয়ে রেখে বড় অংকের কাঁচা টাকা ইনকাম করতে চায়। এবং এটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য সকল ধরনের প্রভাব ও সাপোর্ট এখানে কাজে লাগায়।”

হুট করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলে জানান ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলাম। সমাধানে সর্বাগ্রে সরকারের সদিচ্ছা থাকা এবং হকার জোন নির্ধারণ করে সেখানে ধাপে ধাপে হকারদেরকে পুনর্বাসন করার পরামর্শ তাঁর।

তিনি বলেন, “হকার মুক্ত ফুটপাত বাস্তবায়ন করতে হলে পুরো ইকোসিস্টেমটা মাথায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে। যেখানে নগর পরিকল্পনা, পুনর্বাসন এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়গুলো সমান গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে।”

পাশাপাশি লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করা এবং কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করা গেলে এই সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলাম। এতে যেমন নগরের শৃঙ্খলা ফিরবে, তেমনি হকারদের জীবিকাও সুরক্ষিত থাকবে বলে আশাবাদ জানান তিনি।