নারী, নারী দিবস, সম্মান, স্বামী স্ত্রী, জিবলি আর্ট, এআই, জাতীয়,
দায়িত্ব ও সম্মানের ভারসাম্য প্রয়োজন।   ছবি: আরটিএনএন

এ বছরও আন্তর্জাতিক নারী দিবস এসেছে পবিত্র রমজানের সময়। তাই হয়তো আনুষ্ঠানিক উদযাপনের জৌলুস কিছুটা কম থাকবে। তবে প্রশ্নটা উৎসবের নয়—প্রশ্নটা ভাবনার। নারী দিবস ঘিরে প্রতি বছর যে আবেগ, স্ট্যাটাস আর শুভেচ্ছার ঢল নামে, তার আড়ালে বাস্তবতা ঠিক কতটা বদলায়?

অনেকে মনে করেন, কেবল একদিন নারীকে ফুল দিয়ে সম্মান জানানো বা সামাজিক মাধ্যমে প্রশংসার বন্যা বইয়ে দেওয়াই যেন দায়িত্ব শেষ। অথচ বাস্তব জীবনের সমীকরণ অনেক বেশি জটিল।

অদৃশ্য শ্রমের গল্প
একটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনে নারীর ভূমিকা অনেক সময় এমন—যেন তিনি আছেন, অথচ তাকে দেখা যায় না। ঘর পরিষ্কার, রান্না, কাপড় ধোয়া, সন্তানের যত্ন—সবই যেন নীরবে সম্পন্ন হয়ে যায়। কাজগুলো চলতে থাকলে কেউ খেয়াল করে না; কিন্তু একদিন থেমে গেলেই বোঝা যায়, সেই অদৃশ্য শ্রম কতটা অপরিহার্য ছিল।

কর্মজীবী নারীর দ্বিগুণ দায়িত্ব
কর্মজীবী নারীদের বাস্তবতা আরও কঠিন। অফিসের দায়িত্ব শেষ করে বাড়ি ফিরে তাদের শুরু হয় দ্বিতীয় শিফট—রান্নাঘর, সংসার, সন্তান সব সামলানো। এই বহুমুখী দায়িত্ব সামলে তারা অনেক সময় হয়ে ওঠেন এক ধরনের ‘সুপারওম্যান’।

অন্যদিকে অনেক পুরুষ জানেন যে নারীরা বেশি পরিশ্রম করছেন, কিন্তু সেটি স্বীকার করা মানেই হয়তো নিজের দায়িত্বও বাড়ানো—এই অঘোষিত মানসিকতাই অনেক সময় ভারসাম্যহীনতার জন্ম দেয়।

স্বাস্থ্য ও মানসিক বাস্তবতা
নারীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়গুলো নিয়েও আমাদের সমাজে এখনও অনেক অস্বস্তি ও নীরবতা রয়েছে। বিশেষ করে মাসিক বা হরমোনজনিত পরিবর্তনের সময় একজন নারীর মানসিক চাপ বা অস্বস্তিকে গুরুত্ব দিয়ে বোঝার সংস্কৃতি এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি।

বাবার নিঃস্বার্থ আশ্রয়

জীবনের নানা সম্পর্কে নারী ভালোবাসা পায়—স্বামী, ভাই, সন্তান কিংবা বন্ধুদের কাছ থেকে। তবু অনেক নারীর কাছে বাবার স্নেহ এক আলাদা নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের প্রতীক। সেখানে থাকে নিঃস্বার্থ মমতা আর সীমাহীন প্রশ্রয়।

ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা
সমাজের আরেকটি তিক্ত বাস্তবতা হলো—কিছু ক্ষেত্রে নারীকে এখনও ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখার প্রবণতা। অথচ একই মানুষ নিজের ঘরের মা বা বোনের সম্মানের কথা ভুলে যায়। এই দ্বৈত মানসিকতা সমাজের জন্য বড় এক প্রশ্নচিহ্ন হয়ে আছে।

অবশ্য মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে নারী–পুরুষ উভয়েই একে অন্যকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে। তাই সমস্যাটিকে একপাক্ষিক না দেখে বাস্তবতার সব দিক বিবেচনায় নেওয়াও জরুরি।

সম্পর্কের অদৃশ্য শক্তি
অনেক পুরুষের জীবনের সাফল্যের পেছনেও নারী এক বড় শক্তি। কখনো মা, কখনো বোন, কখনো প্রেমিকা, স্ত্রী বা কন্যা—নানাভাবে তারা সাহস, প্রেরণা এবং মানসিক শক্তি জুগিয়ে যায়। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক অহমের কারণে অনেক সময় সেই অবদান প্রকাশ্যে স্বীকার করা হয় না।

ভারসাম্যের সন্ধান
শেষ পর্যন্ত নারী দিবসের মূল তাৎপর্য এখানেই—এটি যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে ওঠে। সত্যিকার অর্থে প্রয়োজন দায়িত্বের সুষম বণ্টন, পারস্পরিক সম্মান এবং নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ।

যেদিন রাতের পথে নারী নির্ভয়ে চলতে পারবে, যেদিন সম্মান হবে স্বাভাবিক আচরণ—সেদিনই নারী দিবস তার প্রকৃত অর্থ খুঁজে পাবে।

ফুল, শুভেচ্ছা আর সামাজিক মাধ্যমের স্ট্যাটাসের বাইরে গিয়ে যদি আমরা সম্মান ও দায়িত্বের ভারসাম্য গড়ে তুলতে পারি—তবেই এই দিনটির উদযাপন সত্যিকার অর্থে অর্থবহ হবে।

আরবিএ/আরটিএনএন