বাইতুল হিকমাহ যেভাবে বদলে দিয়েছিল পৃথিবীর অর্থনীতি ও বিজ্ঞান
বাইতুল হিকমাহ যেভাবে বদলে দিয়েছিল পৃথিবীর অর্থনীতি ও বিজ্ঞান ।   ছবি: সংগৃহীত

আজকের পৃথিবীতে ‘সিলিকন ভ্যালি’কে বলা হয় প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের রাজধানী। কিন্তু আজ থেকে প্রায় বারো শ বছর আগে পৃথিবীর বুকে এমন এক ‘মেধাভিত্তিক সামাজ’ গড়ে উঠেছিল, যা শুধু ধর্ম বা দর্শনের চর্চায় সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং জ্ঞানকে রূপান্তর করেছিল সে যুগের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তিতে। 

ইরাকের বাগদাদে গড়ে ওঠা সেই জ্ঞানকেন্দ্রটির নাম ‘বাইতুল হিকমাহ’ বা ‘হাউস অব উইজডম’।

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদ ও তার পুত্র খলিফা আল-মামুনের হাত ধরে নবম শতাব্দীতে এই প্রতিষ্ঠানের স্বর্ণযুগ শুরু হয়। তবে একে কেবল একটি লাইব্রেরি বা অনুবাদ কেন্দ্র ভাবলে ভুল হবে। বাইতুল হিকমাহ ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ‘থিংক ট্যাংক’ এবং বৈশ্বিক করপোরেট সংস্কৃতির আদি রূপ।

অনুবাদকের পারিশ্রমিক: বইয়ের ওজনে সোনা!

বাইতুল হিকমাহর সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক ছিল এর অনুবাদ প্রকল্প। তৎকালীন খলিফা ঘোষণা করেছিলেন, গ্রিক, সংস্কৃত বা ল্যাটিন ভাষা থেকে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বই নির্ভুলভাবে আরবিতে অনুবাদ করতে পারলে, সেই অনূদিত বইয়ের ওজনের সমপরিমাণ খাঁটি সোনা পুরস্কার দেওয়া হবে।

আজকের যুগে যেমন বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিশ্বের সেরা মেধাবীদের আকর্ষণ করতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে, ঠিক তেমনি খলিফা আল-মামুন সে যুগেই ব্রেন ড্রেন বা মেধা পাচারের ধারণাটি উল্টে দিয়েছিলেন। তার এই লোভনীয় ও সম্মানজনক অফারের কারণে তৎকালীন বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য, পারস্য এবং ভারত উপমহাদেশ থেকে সেরা বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও অনুবাদকেরা বাগদাদে এসে ভিড় জমান। ধর্ম বা জাতিগত পরিচয় সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি; মেধার মূল্যায়নই ছিল একমাত্র শর্ত।

বিশ্বের প্রথম ‘ওপেন সোর্স’ ল্যাবরেটরি

বাইতুল হিকমাহ কেবল পুরোনো বই অনুবাদ করেই দায়িত্ব শেষ করেনি। এখানকার পণ্ডিতেরা অনুবাদ করা তত্ত্বগুলোর ব্যবচ্ছেদ করতেন। গ্রিক দার্শনিক ইউক্লিড কিংবা ভারতীয় গণিতবিদ আর্যভট্টের তত্ত্বগুলোকে সমন্বয় করে তারা তৈরি করেন নতুন জ্ঞান।

আজকের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আমরা যাকে ‘ওপেন সোর্স কালচার’ বলি, বাইতুল হিকমাহ ছিল ঠিক তাই। বিভিন্ন সংস্কৃতির জ্ঞানকে এক ছাদের নিচে এনে নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা হতো। এই ল্যাবরেটরি থেকেই জন্ম নেন আল-খোয়ারিজমি, যার হাত ধরে আসে ‘অ্যালজেব্রা’ (বীজগণিত) এবং আধুনিক কম্পিউটারের মূল ভিত্তি ‘অ্যালগরিদম’। এখানেই কাজ করতেন বনু মুসা ভাইয়েরা, যারা স্বয়ংক্রিয় বাতি ও যন্ত্র প্রকৌশলের এমন সব উদ্ভাবন করেছিলেন, যা আধুনিক রোবোটিকসের আদি রূপ।

ধ্বংসস্তূপ থেকে বেঁচে যাওয়া জ্ঞান এবং আজকের বিশ্ব

১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে মোঙ্গল সেনাপতি হালাকু খানের বাগদাদ আক্রমণের মধ্য দিয়ে এই জ্ঞানসাম্রাজ্যের অবসান ঘটে। দাজলা (টাইগ্রিস) নদীর পানি লাইব্রেরির বইয়ের কালিতে কালো হয়ে যাওয়ার গল্পটা বহুল পরিচিত। তবে এই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও দূরদর্শী জ্যোতির্বিদ আল-তুসি পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে প্রায় চার লাখ বিরল পাণ্ডুলিপি আগেভাগেই ইরানের মারাঘেহ মানমন্দিরে সরিয়ে নিয়েছিলেন।

ইতিহাসবিদদের মতে, বাইতুল হিকমাহর সেই রক্ষা পাওয়া জ্ঞানই পরবর্তীকালে স্পেনের কর্ডোভা হয়ে ইউরোপে প্রবেশ করে এবং ইউরোপীয় রেনেসাঁর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।

যে কারণে আজও প্রাসঙ্গিক বাইতুল হিকমাহ

বর্তমান বিশ্বে যে দেশ বা জাতি তথ্যের দিক থেকে যত এগিয়ে, তারা অর্থনীতিতে ততটাই শক্তিশালী। বাইতুল হিকমাহর ইতিহাস প্রমাণ করে, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মেধার মুক্ত চর্চা এবং গবেষণায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ কীভাবে একটি অনুন্নত সমাজকে পৃথিবীর চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে পারে। বারো শ বছর আগের বাগদাদ আজ আর নেই, কিন্তু আধুনিক জ্ঞানভিত্তিক পৃথিবীর যে কাঠামো, তার ডিএনএ রয়ে গেছে বাইতুল হিকমাহর ধ্বংসস্তূপের নিচেই।