মধ্যপ্রাচ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টের জেরে ব্যাপক জেল-নির্বাসন
মধ্যপ্রাচ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টের জেরে ব্যাপক জেল-নির্বাসন   ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতময় পরিস্থিতির জের ধরে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর কড়া নজরদারি ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ বা উসকানিমূলক কনটেন্ট পোস্ট করার অভিযোগে বাহরাইন ও কুয়েতে সাংবাদিক, ইনফ্লুয়েন্সার, মানবাধিকারকর্মীসহ সাধারণ নাগরিকদের গ্রেফতার, কারাদণ্ড এবং নাগরিকত্ব বাতিলের মতো ঘটনা ঘটছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, চলমান এই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির অজুহাতে ওই অঞ্চলের দেশগুলোতে মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বড় ধরনের আঘাত হানা হচ্ছে।

সম্প্রতি কুয়েতের নিরাপত্তা আদালত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ উসকে দেওয়া এবং ভুয়া খবর ছড়ানোর অভিযোগে একযোগে ১৩৫ জনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ১৭ জনকে তিন বছরের কারাদণ্ড এবং এক পলাতক আসামিকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

যদিও এই মামলায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখক ও সাংবাদিক আহমেদ শিহাব-এলদিনসহ ১০৯ জনকে নির্দিষ্ট পোস্ট মুছে ফেলার শর্তে খালাস দেওয়া হয়। কুয়েতের নতুন ডিক্রি অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারী উপাদান প্রকাশের জন্য তিন থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং মোটা অঙ্কের জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া দেশটির নাগরিকত্ব আইনের বিশেষ ধারা ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে যে কারও নাগরিকত্ব প্রত্যাহারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অনুরূপভাবে বাহরাইনেও সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করার অপরাধে ব্যাপক ধরপাকড় ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি রাজকীয় ডিক্রি ও জাতীয়তা আইনের আওতায় একযোগে ৬৯ জনের নাগরিকত্ব বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছে।

কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব ব্যক্তি অ-বাহরাইনি বংশোদ্ভূত এবং তারা শত্রুভাবাপন্ন ইরানি কর্মকাণ্ডকে প্রশংসা ও সমর্থন করার পাশাপাশি বাহ্যিক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা আসছিল। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, সংঘাত শুরুর পর থেকে বাহরাইনে নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্কসহ প্রায় তিন শতাধিক মানুষকে আটক করা হয়েছে এবং অনেক বিদেশি নাগরিককে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে কুয়েত ও বাহরাইনে এই আইনি কড়াকড়ি এবং সড়কগুলোতে বিশেষ চেকপোস্ট বসিয়ে সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোন তল্লাশির ঘটনা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মুক্তমতের পরিবেশকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

তাদের মতে, যথাযথ আইনি সহায়তা না দেওয়া এবং আপিলের সুযোগ সীমিত করার মাধ্যমে সেখানে এক ধরনের সেলফ-সেন্সরশিপ বা স্ব-নিয়ন্ত্রণের ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সরকারি মুখপাত্রদের দাবি, এই পদক্ষেপগুলো কোনো সাধারণ মত প্রকাশের বিরুদ্ধে নয়, বরং ইরানের মতো বিদেশি রাষ্ট্রের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক এবং আগ্রাসন থেকে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষা করার জন্যই আইনানুযায়ী এই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।