প্রতিকী ছবি।
প্রতিকী ছবি।   ছবি: এআই

পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এমন নির্বাচন আগে হয়নি। ভোটের আগে ৯১ লক্ষ নাম তালিকা থেকে কাটা, ভোটের দিন মাঠে জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ), আর ফলাফলের পরপরই বুলডোজার আর 'জয় শ্রীরাম' স্লোগানে মুখর রাস্তাঘাট। গত ৪ মে ঘোষিত ফলাফলে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ২৯৪টির মধ্যে ২০৭টি আসন পেয়ে ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। কিন্তু এই জয়ের পেছনে যে সংখ্যাগুলো আছে, সেগুলো নিছক রাজনৈতিক পরিবর্তনের গল্প বলে না — বলে এক সুচিন্তিত কৌশলের কথা। ফলে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নিয়ে বাড়ছে রহস্য। সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছে আরটিএনএন।

ভোটার তালিকায় বিশাল পরিবর্তন। 

নির্বাচনের আগে ভারতের নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গে 'বিশেষ নিবিড় তালিকা সংশোধন' বা এসআইআর কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রায় ছয় মাসব্যাপী এই প্রক্রিয়ায় মোট ৯১ লক্ষের বেশি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়, যা রাজ্যের মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ।

কলকাতার গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'সবর ইনস্টিটিউট'-এর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য — বিজেপির জেতা ২০৭টি আসনের মধ্যে ১০৫টিতেই দলটির জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি ভোটার তালিকা থেকে কাটা পড়েছেন। অর্থাৎ যদি এই বাদ পড়া ভোটাররা ভোট দিতে পারতেন, তাহলে ফলাফল ভিন্ন হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল। এই ১০৫টি আসনের ৮৬টিতেই বিজেপি আগে কখনো জয় পায়নি।

বাঁকুড়ার ইন্দাস আসনের উদাহরণ স্পষ্ট — ২০২৪ সালের লোকসভায় তৃণমূল সেখানে ৯ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিল। এসআইআর প্রক্রিয়ায় সাড়ে সাত হাজার ভোটার বাদ পড়ার পর বিজেপি এবার আসনটি জিতেছে মাত্র ৯০০ ভোটের ব্যবধানে। যাদবপুরে ৫৬ হাজারের বেশি নাম কাটা পড়েছে, বিজেপি সেখানে প্রথমবারের মতো জিতেছে ২৭ হাজার ভোটে।

খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে ৫১ হাজারের বেশি ভোটার বাদ পড়েছেন। মমতা হেরেছেন ১৫ হাজার ১০৫ ভোটে। টানা ২০ বছর ধরে জেতা মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস টালিগঞ্জে হেরেছেন ৬ হাজার ভোটে, অথচ সেই কেন্দ্রে নাম বাদ গেছে ৩৭ হাজার ৮৮৯ জনের।

কারা বাদ পড়লেন?

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসআইআর প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মুসলিম সংখ্যালঘু, নারী এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠী। নির্বাচন কমিশন বাদ দেওয়া নামের বেশিরভাগকে 'লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি' বলে চিহ্নিত করেছে — যে বিভাগটি বিশেষভাবে পশ্চিমবঙ্গের জন্যই তৈরি করা হয়েছিল।

সবর ইনস্টিটিউটের গবেষকরা বলছেন, এসআইআর ফর্মে বাবা-মা এবং ক্ষেত্রবিশেষে দাদা-দাদির তথ্য ও কাগজপত্র চাওয়া হয়েছিল। এই শর্ত বড় পরিবার, অল্পবয়সে বিবাহিত নারী এবং গ্রামীণ দরিদ্র মানুষদের জন্য পূরণ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। গবেষকরা একে 'প্রক্সি এনআরসি' বলে অভিহিত করেছেন — যা ভবিষ্যতে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য তথ্যভান্ডার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

বিজেপি শুরু থেকেই এই প্রক্রিয়াকে 'ভুয়া ভোটার ও অবৈধ অনুপ্রবেশকারী' সরানোর পদক্ষেপ বলে সমর্থন দিয়ে আসছিল, আর তৃণমূল কংগ্রেস বলেছে এটি প্রকৃত ভোটারদের বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র।

'অনুপ্রবেশ' এর নামে ব্যাপক ধরপাকড়

রাজ্যের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিধানসভা নির্বাচনে জাতীয় তদন্ত সংস্থাকে (এনআইএ) মোতায়েন করা হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের এই সংস্থার উপস্থিতি ছিল রাজনৈতিক বার্তাস্বরূপ। পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে ২,২০০ কিলোমিটার সীমান্ত, সীমান্ত বেড়া, 'অনুপ্রবেশ' এবং শিলিগুড়ি করিডরকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত করে বিজেপি তার প্রচারণার কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু তৈরি করেছিল। মুসলিম ভোটারদের মধ্যে এই বার্তা ছড়িয়ে পড়ে যে, বিজেপি ক্ষমতায় এলে নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) কার্যকর হবে।

ফলাফলের পর রক্তপাত, ধর্মের নামে বিভাজন

ফলাফল ঘোষণার পরপরই পশ্চিমবঙ্গজুড়ে ব্যাপক সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার খবর আসতে শুরু করে। কলকাতা, হাওড়া, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনাসহ একাধিক জেলায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।

বিজেপি বলেছে তাদের দুই কর্মী নিহত হয়েছেন, তৃণমূল বলছে তাদের দুই কর্মীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তিনজন পুলিশ কর্মকর্তা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ২ জন সেনাসদস্য ও যার মধ্যে একজন নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। 

কলকাতার ঐতিহাসিক নিউ মার্কেট ও হগ মার্কেট এলাকায় বুলডোজার দিয়ে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয় ও মাংসের দোকান ভাঙার অভিযোগ ওঠে। জাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গেরুয়া পতাকা ও 'জয় শ্রীরাম' স্লোগান ছড়িয়ে পড়ে। বিজেপিপন্থী কর্মচারী পরিষদ ক্যাম্পাসকে 'নকশালমুক্ত' করার ডাক দেয়।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বিজেপি সমর্থকরা মুসলিম মালিকানাধীন দোকান, বিরিয়ানির দোকান ও মাংসের দোকান বন্ধ করে দেওয়ার জন্য হুমকি দিচ্ছে। দার্জিলিংয়ের জামা মসজিদ ভাঙচুর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ আসে।

এছাড়াও বিভিন্ন মুসলিম স্থাপনার নাম পরিবর্তন যেমন সিরাজ উদ্যান এর নাম পাল্টে শিবাজী উদ্যান ও মসজিদবাড়ি রোডের নাম পরিবর্তনের মত কর্মকাণ্ডের অভিযোগও আছে বিজেপি সমর্থকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। 

'ডাবল ইঞ্জিন' সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ

কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দল ক্ষমতায় থাকার এই 'ডাবল ইঞ্জিন' সুবিধাকে বিজেপি এখন পুরোপুরি কাজে লাগাতে চাইছে। গত ১৫ বছরে রাজ্যে সিবিআই, ইডি ও কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলো বারবার বাধার সম্মুখীন হয়েছে — এবার সেই পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী দিনে তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোর অভিযান আরও তীব্র হতে পারে।

সংখ্যার রাজনীতি, সংখ্যালঘুর ভবিষ্যৎ

মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ ও উত্তর ২৪ পরগনা এবং বীরভূমের মতো মুসলিম-অধ্যুষিত জেলাগুলোতে ২০২১ সালে তৃণমূল ১১৮টির মধ্যে ১০৩টি আসন পেয়েছিল। এবার সেটা ৫৭-তে নেমে আসে, আর বিজেপি ১৪ থেকে লাফ দিয়ে ৪৯-এ পৌঁছায়। এই সংখ্যায় শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, আছে ৯১ লক্ষ বাদ পড়া ভোটারের ছায়া।

পশ্চিমবঙ্গের এই ঘটনাপ্রবাহ নিছক একটি রাজ্যের ভোটের গল্প নয়। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে — নির্বাচনী প্রশাসন, কেন্দ্রীয় সংস্থার মোতায়েন, নাগরিকত্বের ভয় এবং ভোটের পরের সহিংসতা কীভাবে একসূত্রে গেঁথে একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক বদলের পথ তৈরি করতে পারে।